ইতিহাসের চার মহান শাসক: যাদের মুকুট ছিল ইনসাফ ও বিনয়। .

 


ইতিহাসের চার মহান শাসক: যাদের মুকুট ছিল ইনসাফ ও বিনয়।

.

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পর খিলাফতে রাশেদার যে ত্রিশ বছর অতিবাহিত হয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

.

আবু বকর (রা.) – সংকটের কান্ডারি

নবিজির ইন্তেকালের পর গোটা আরবে এক চরম শূন্যতা ও অস্থিরতা বিরাজ করছিল। অনেকেই ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল, আবার কেউ কেউ নিজেকে ভণ্ড নবি হিসেবে দাবি করছিল। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে ইসলামের হাল ধরেন আবু বকর (রা.)। তিনি স্বভাবগতভাবে অত্যন্ত কোমল হলেও ঈমানের প্রশ্নে ছিলেন পর্বতের মতো অটল। 

.

দিশেহারা মুসলমানদের শান্ত করতে তিনি ঐতিহাসিক এক ঘোষণা দেন: "তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মাদ (সা.)-এর উপাসনা করতে, তারা জেনে রাখো তার মৃত্যু হয়েছে। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করো, তারা জেনে রাখো আল্লাহ চিরঞ্জীব, তাঁর কোনো মৃত্যু নেই।" মাত্র দুই বছরের সংক্ষিপ্ত শাসনামলে তিনি সমস্ত বিদ্রোহ দমন করে ইসলামি রাষ্ট্রকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে এক শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে যান।

.

উমার (রা.) – ন্যায়বিচার ও বিনয়ের প্রতীক

আবু বকর (রা.)-এর পর খিলাফতের দায়িত্ব নেন উমার (রা.)। তার শাসনকাল ছিল যেন এক জীবন্ত মহাকাব্য। অর্ধ-পৃথিবীর একচ্ছত্র অধিপতি হয়েও তার পরনে থাকত তালি দেওয়া জীর্ণ পোশাক। প্রজাদের সুখ-দুঃখের খোঁজ নিতে তিনি রাতের আঁধারে মদিনার রাস্তায় ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতেন। একবার এক ক্ষুধার্ত পরিবারের শিশুদের কান্না থামাতে এক মাকে চুলায় শুধু পানি ফোটাতে দেখে এই পরাক্রমশালী খলিফা নিজেই আটার বস্তা কাঁধে বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তাদের ঘরে। 

.

তার আমলে সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। জেরুজালেম বিজয়ের পর ভৃত্যের সাথে উটের পিঠে পালাক্রমে চড়ে তিনি যে অভাবনীয় সাম্য ও বিনয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা আজও ইতিহাসবিদদের অবাক করে।

.

উসমান (রা.) – উম্মাহর ঐক্য ও কুরআনের রক্ষক

উমার (রা.)-এর পর মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব আসে অত্যন্ত লাজুক, বিনয়ী ও প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী হযরত উসমান (রা.)-এর হাতে। তার সময়ে মুসলিম সাম্রাজ্য আরও সমৃদ্ধি লাভ করে এবং শক্তিশালী মুসলিম নৌবাহিনীর গোড়াপত্তন হয়। তবে তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো পবিত্র কুরআনের প্রমিত বা একীভূত পাণ্ডুলিপি তৈরি করা।

.

সাম্রাজ্য সম্প্রসারিত হওয়ার কারণে কুরআনের তিলাওয়াতে যেন কোনো ভিন্নতা বা বিকৃতি না আসে, সেজন্য তিনি সাহাবিদের সমন্বয়ে একটি আদর্শ পাণ্ডুলিপি তৈরি করে সর্বত্র পাঠিয়ে দেন। তার বিদায়বেলাটি ছিল অত্যন্ত করুণ ও বীরত্বপূর্ণ। বিদ্রোহীরা যখন তাকে অবরুদ্ধ করে, মদিনার পবিত্র মাটিতে রক্তপাত এড়াতে তিনি প্রহরীদের অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেননি। উম্মাহর ঐক্যের খাতিরে তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেন এবং কুরআন তিলাওয়াতরত অবস্থায় শা*হাদাত বরণ করেন।

.

আলি (রা.) – প্রজ্ঞা ও বীরত্বের প্রতিমূর্তি

সর্বশেষ খলিফা হিসেবে দায়িত্ব নেন আলি (রা.)। তার শাসনকাল ছিল চরম প্রতিকূলতা আর অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ভরপুর এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়। ষড়যন্ত্রকারীরা মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। একদিকে যেমন তাকে বিদ্রোহীদের মোকাবিলা করতে হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি তিনি অবিচল ছিলেন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায়

.

যু*দ্ধের ময়দানে তার কিংবদন্তিতুল্য তরবারি 'জুলফিকার' যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠত, তেমনি তার প্রখর প্রজ্ঞা ও মেধা দিয়ে তিনি কঠিন সব আইনি জটিলতার সমাধান করতেন। শত রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও তিনি ইসলামের মূল আদর্শকে সমুন্নত রেখেছিলেন।

.

৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে আলি (রা.)-এর শা*হাদাতের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে খোলাফায়ে রাশেদার গৌরবোজ্জ্বল ত্রিশ বছরের। এই চার মহামানব বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়েও কখনো রাজকীয় জাঁকজমক বা ভোগবিলাসের মোহজালে আবদ্ধ হননি। তাদের মাথায় কোনো রত্নখচিত মুকুট ছিল না, তাদের মুকুট ছিল ইনসাফ ও বিনয়। তাদের শাসনামলে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, সরল জীবনযাপন এবং জনকল্যাণমূলক শাসনের এমন বহু দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজও ইতিহাসে আদর্শ হিসেবে স্মরণ করা হয়।

মন্তব্যসমূহ