রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওযু করার পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি


 

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওযু করার পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি


ওযু ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি কেবল শরীরের কিছু অঙ্গ ধোয়ার নাম নয়; বরং এটি একজন মুসলিমের বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক পবিত্রতার মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা ওযুকে সালাতের পূর্বশর্ত হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তাই একজন মুমিনের জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ যেভাবে ওযু করতেন, ঠিক সেই পদ্ধতি অনুসরণ করাই সর্বোত্তম।


আল্লাহ তাআলা বলেন:


﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ﴾


"হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা সালাতের জন্য দাঁড়াবে, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ধুয়ে নাও, কনুই পর্যন্ত হাত ধুয়ে নাও, মাথা মাসেহ করো এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধুয়ে নাও।"

— সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৬


▪️ওযুর আগে নিয়তের বিধান


ওযুর জন্য অন্তরে নিয়ত করা আবশ্যক। নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা রাসূলুল্লাহ ﷺ বা সাহাবায়ে কিরাম থেকে প্রমাণিত নয়। তাই অন্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পবিত্রতা অর্জনের ইচ্ছাই যথেষ্ট।


রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:


إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ


"সমস্ত কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।"

— সহীহ বুখারী, হাদিস: ১; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৯০৭


▪️ওযু শুরু করার সময় "বিসমিল্লাহ" বলা


ওযু শুরু করার সময় বলতে হবে—


بِسْمِ اللَّهِ


"আল্লাহর নামে(ওযু শুরু করলাম)।"


রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:


لَا وُضُوءَ لِمَنْ لَمْ يَذْكُرِ اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهِ


"যে ব্যক্তি ওযুর শুরুতে আল্লাহর নাম উল্লেখ করে না, তার ওযু পূর্ণাঙ্গ হয় না।"

— সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ১০১; সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস: ৩৯৯


▪️রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওযুর ধাপসমূহ


১. দুই হাতের কবজি পর্যন্ত তিনবার ধোয়া


ওযুর শুরুতে উভয় হাত কবজি পর্যন্ত তিনবার ধুয়ে নেওয়া সুন্নত।


২. তিনবার কুলি করা ও নাকে পানি দিয়ে পরিষ্কার করা


একই আঁজলা পানি দিয়ে কুলি ও নাকে পানি টেনে বাম হাত দিয়ে নাক পরিষ্কার করা সুন্নত।


৩. মুখমণ্ডল তিনবার ধোয়া


কপালের উপরিভাগ থেকে থুতনি পর্যন্ত এবং এক কান থেকে অন্য কান পর্যন্ত সম্পূর্ণ মুখ ধুতে হবে।


৪. ডান হাত ও বাম হাত কনুইসহ তিনবার ধোয়া


প্রথমে ডান হাত, তারপর বাম হাত কনুইসহ ধোয়া সুন্নত।


৫. মাথা মাসেহ করা এবং কান মাসেহ করা


দুই হাত ভিজিয়ে মাথার সামনের দিক থেকে পিছনে নিয়ে আবার সামনে ফিরিয়ে আনতে হবে। একই পানিতে কান মাসেহ করতে হবে।


৬. ডান পা ও বাম পা টাখনুসহ তিনবার ধোয়া


আঙুলের ফাঁকে পানি পৌঁছানো এবং টাখনুসহ ভালোভাবে ধোয়া আবশ্যক।


▪️একবার, দুইবার নাকি তিনবার?


রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনো প্রতিটি অঙ্গ একবার, কখনো দুইবার এবং অধিকাংশ সময় তিনবার ধুয়েছেন।

— সহীহ বুখারী, হাদিস: ১৫৭–১৫৯


তবে মাথা মাসেহ সর্বদা একবারই করেছেন।


▪️ওযুর পর যে দোয়া পড়তে হবে


রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ওযু শেষে এই দোয়া পড়া সুন্নত—

.

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله، اللهم اجعلني من التوابين واجعلني من المتطهرين


"আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। হে আল্লাহ! আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং আমাকে পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।"


রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে ওযু করে এই দোয়া পড়বে, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হবে।

— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৩৪


▪️ওযুর সময় নির্দিষ্ট কোনো দোয়া আছে কি?


মুখ ধোয়ার সময়, হাত ধোয়ার সময় বা পা ধোয়ার সময় নির্দিষ্ট কোনো দোয়া রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে সহীহভাবে প্রমাণিত নয়।


শাইখ ইবন বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, এ বিষয়ে প্রচলিত দোয়াগুলোর কোনো সহীহ ভিত্তি নেই।


▪️ওযুর গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতসমূহ


- ডান দিক থেকে শুরু করা।

- আঙুল ও পায়ের আঙুলের ফাঁক খিলাল করা।

- দাড়ি ঘন হলে খিলাল করা।

- প্রতিটি অঙ্গ ভালোভাবে ধোয়া।

- অযথা বেশি পানি অপচয় না করা।

- ধারাবাহিকভাবে ওযু সম্পন্ন করা।

- অঙ্গ শুকিয়ে যাওয়ার আগে পরবর্তী অঙ্গ ধোয়া।


▪️ওযুতে যে ভুলগুলো প্রায়ই দেখা যায়


- টাখনু বা গোড়ালি শুকনা রেখে দেওয়া।

- কনুই পুরোপুরি না ধোয়া।

- মাথার সামান্য অংশ মাসেহ করে ছেড়ে দেওয়া।

- নাকে পানি না দেওয়া।

- আঙুলের ফাঁকে পানি না পৌঁছানো।

- ওযুর সময় বিভিন্ন অপ্রমাণিত দোয়া পড়াকে সুন্নত মনে করা।

- অতিরিক্ত পানি অপচয় করা।


রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:


 وَيْلٌ لِلْأَعْقَابِ مِنَ النَّارِ


"যেসব গোড়ালি (ওযুতে শুকনা থাকে), সেগুলোর জন্য জাহান্নামের আগুনের ধ্বংস রয়েছে।"

— সহীহ বুখারী, হাদিস: ১৬৫; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৪২


▪️ওযুর ফজিলত


রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:


"যখন কোনো মুসলিম সুন্দরভাবে ওযু করে, তখন তার মুখ, হাত ও পা থেকে পানির সঙ্গে সঙ্গে তার গুনাহসমূহ ঝরে পড়ে।"

— সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৪৪


আরেক হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন উম্মতে মুহাম্মাদ ﷺ ওযুর অঙ্গগুলো উজ্জ্বল অবস্থায় উপস্থিত হবে।

— সহীহ বুখারী, হাদিস: ১৩৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৪৬

© হাদীস টিম  © Al Fatiha Foundation


মন্তব্যসমূহ