অশ্বারোহণে শাণিত বর্শা হাতে এগিয়ে চলেছেন, তিনি হচ্ছেন ইসলামের প্রকৃত এক যোদ্ধাসম্রাট আলমগীর আওরঙ্গজেব
শিরোনাম: বাদশা মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব রহিমাহুল্লাহ – এক সত্যিকারের খলীফাতুল আরদ।
ছবির বর্ণনা:
এই শিল্পকর্মে যে ব্যক্তিটি অশ্বারোহণে শাণিত বর্শা হাতে এগিয়ে চলেছেন, তিনি হচ্ছেন ইসলামের প্রকৃত এক যোদ্ধা, উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ ও ধর্মপ্রাণ শাসক—আলমগীর আওরঙ্গজেব রহিমাহুল্লাহ।
তাঁর পোশাক, অস্ত্র ও ঘোড়ার অলংকার তার শান-শওকত নয়, বরং তা ছিল দীন প্রতিষ্ঠার এক দৃশ্যপট।
-মুঘল সাম্রাজ্যের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বাদশাহ আওরঙ্গজেব আলমগীর (রহ.) সিংহাসনে আরোহণের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হিন্দুস্তানের উন্নতির জন্য দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। তিনি এত বেশি পরিশ্রম করতেন যে, ১৬৬২ ঈসাব্দে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী সম্রাট হওয়ার পরও তিনি বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে না দিয়ে নিজেকে জনসাধারণের এক সামান্য সেবক বলে মনে করতেন। তার এমন মহান মানসিকতাকে হিন্দু ঐতিহাসিকরা সন্দেহপ্রবণ মানসিকতা বলে অভিহিত করেছে। তাদের অভিযোগ, সম্রাট ছিলেন অত্যন্ত সন্দেহপ্রবণ; কাউকে ভরসা করতেন না, এজন্য সব কাজ নিজে একাই করতে চাইতেন। কিন্তু এই সাম্প্রদায়িক ইতিহাসবিদরা ভুলে গেছে যে, শাসকের কাজই হলো জনসাধারণের সেবা করা। জনসাধারণ শাসকের সেবক নয়, বরং শাসকই জনসাধারণের সেবক। সুতরাং, এমন মহান গুণের নিন্দা করা মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
-সম্রাট নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করায় এই সাম্প্রদায়িক ইতিহাসবিদদের কাছে কাউকে বিশ্বাস না করা অত্যন্ত সন্দেহপ্রবণ একজন স্বৈরাচারী শাসক হয়ে গেছে। কিন্তু সম্রাট যদি বিলাসী জীবনযাপন করত, তাহলে এরাই আবার অভিযোগ করত—সম্রাট ছিল চরিত্রহীন, বিলাসী; সারাদিন আমোদ-প্রমোদে ডুবে থাকত। প্রজারা যখন না খেয়ে মরত, সম্রাট তখন বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দিত। প্রজাদের সুখ-শান্তির প্রতি বিন্দুমাত্র খেয়াল ছিল না তার। মূলত এই সাম্প্রদায়িক ইতিহাসবিদরা হলো একেকটা দুমুখো সাপ। এদের কাছে ভালো-মন্দের পার্থক্য নির্ণীত হয় ধর্মের ভিত্তিতে। এজন্যই এমন মহান গুণ তাদের কাছে সন্দেহপ্রবণ মানসিকতা।
-সম্রাটের এমন কঠোর পরিশ্রম সম্পর্কে ফরাসি পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ার তার ভ্রমণকাহিনীতে একটি চমৎকার ঘটনা উল্লেখ করেছে। একবার রাজসভার এক বিখ্যাত ওমরাহ সম্রাটকে বিনীতভাবে বলে, "জাহাপনা! আপনি যেভাবে দিনরাতের সারাটা সময় রাজকার্য নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন, তাতে আপনার স্বাস্থ্যহানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি এতে আপনার মানসিক সজীবতাও নষ্ট হতে পারে।" শুভাকাঙ্ক্ষী ওমরাহের কথাগুলো সম্রাটের কাছে গ্রহণযোগ্য তো মনে হয়ইনি, বরং তা চাটুকারিতা ধাঁচের মনে হয়েছে। এজন্য সম্রাট ধীরপায়ে অন্য এক ওমরাহের কাছে এগিয়ে গিয়ে নাতিদীর্ঘ যে কথাগুলো বলেন তা থেকে তার মহান চরিত্রের স্পষ্ট আভাস পাওয়া যায়।
-সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর (রহ.) বলেন,
"আপনারা সকলেই সুধীজন, বিদ্বান ও বুদ্ধিমান। আপনারা জানেন সঙ্কটের সময়ে সম্রাটের কর্তব্য কী। জাতি বা দেশের সঙ্কটকালে সম্রাটের একমাত্র কর্তব্য হলো তার নিজের জীবন বিপন্ন করে, প্রয়োজন হলে তলোয়ার হাতে নিয়ে প্রজাদের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়া। সম্রাটের এই কর্তব্য সম্পর্কে আপনাদের মধ্যে নিশ্চয়ই মতভেদ নেই। কিন্তু তবুও আমার এই শুভাকাঙ্ক্ষী ওমরাহটি আমাকে বোঝাতে চাইছেন যে, প্রজাসাধারণের মঙ্গলের জন্য আমার নাকি খুব একটা মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। তার জন্য একটি বিনিদ্র রাত্রিও যাপন করা আমার উচিৎ নয়, একদিনের জন্যও আমোদ-প্রমোদ বর্জন করা ঠিক নয়। তার মতে, আমার উচিৎ সবসময় নিজের স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখা এবং আমার ভোগবিলাস সম্বন্ধে সচেতন হওয়া। হয়তো তিনি চান যে, কোনো একজন উজিরের ওপর রাজ্যের পুরো দায়িত্ব তুলে দিয়ে আমি নিষ্কৃতি পাই। তিনি জানেন না বোধ হয়, সম্রাটের ছেলে হয়ে যখন জন্মেছি এবং সিংহাসনে বসেছি, তখন আল্লাহ আমাকে নিজের জন্য বাঁচার ও চিন্তা করার সুযোগ দেননি—তিনি আমার প্রজাদের সুখ ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য আদেশ দিয়েছেন। যেখানে প্রজাদের সুখ নেই, সেখানে আমারও সুখ নেই। প্রজাদের সুখই আমার সুখ। প্রজাদের সুখ ও শান্তিই আমার সর্বক্ষণের ভাবনা। একমাত্র ন্যায়বিচার, রাজকীয় কর্তৃত্ব ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সাময়িকভাবে এ চিন্তা বিসর্জন দেওয়া যায়, তা ছাড়া অন্য কোনো সময় নয়।
নিষ্ক্রিয়তা বা অন্যের ওপর নিজের দায়িত্ব চাপানোর ফলাফল যে কী রকম ভয়াবহ হতে পারে, সে সম্বন্ধে আমার হিতাকাঙ্ক্ষী পরামর্শদাতার বোধ হয় কোনো ধারণা নেই। এ জন্যই তো মহাকবি সাদি বলেছেন, “রাজা হয়ে জন্মো না, রাজা হয়ো না! যদি রাজা হও, তাহলে প্রতিজ্ঞা করো যে তোমার রাজ্যে তুমি নিজেই শাসন করবে।”
আমার ঐ শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধুটিকে বলুন, তিনি যদি সত্যি সত্যিই আমার প্রিয়পাত্র হতে চান, তাহলে এরকম সদুপদেশ দেওয়ার বা অকারণে আমার মোসাহেবি করার তার কোনো প্রয়োজন নেই। ভবিষ্যতে আর যেন কোনোদিন তিনি এ ধরনের অযাচিত উপদেশ দিতে না আসেন। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও ভোগ-বিলাসের জন্য মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি এমনিতেই যথেষ্ট সজাগ, তাকে জাগাবার জন্য কোনো উপদেশের প্রয়োজন হয় না। ঘরে আমাদের স্ত্রীরাই সে কাজ অনেকটা করতে পারেন। তার জন্য রাষ্ট্রীয় পরামর্শদাতার দরকার নেই।"
-এই হলো মহানুভব আওরঙ্গজেব—যিনি হিন্দুস্তানের সম্রাট হওয়ার পরও ছিলেন সর্বসাধারণের এক সামান্য সেবক।
---
জীবনী ও ইতিহাস:
১. জন্ম ও পরিবার:
পুরো নাম: আবুল মুযাফফর মুইনুদ্দীন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব আলমগীর
জন্ম: ৩ নভেম্বর ১৬১৮, দাহোদ, গুজরাট
পিতা: সম্রাট শাহজাহান
মাতা: মুমতাজ মহল
ধর্মীয় শিক্ষাগুরু: হজরত হাফেজ শায়খ সেলিম চিশতি (রহ.)
---
২. শৈশব ও ধর্মীয় অনুশীলন:
ছোটবেলা থেকেই আওরঙ্গজেব ছিলেন গম্ভীর, বিনয়ী ও অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ। অন্যান্য মুঘল যুবরাজরা যেখানে নাচ-গানে সময় কাটাত, তিনি সেখানে কুরআন হিফজ করেছিলেন। হানাফি মাজহাব অনুসরণকারী এই মহান শাসক নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়তেন এবং ইসলামি ফিকহ শিখতেন।
---
৩. ক্ষমতা গ্রহণ ও খেলাফত প্রতিষ্ঠা:
১৬৫৮ সালে, নিজের ভাই দারাশিকোকে পরাজিত করে দিল্লির সিংহাসনে বসেন।
তিনি খলীফা শব্দের প্রকৃত মর্ম বুঝতেন—তাঁর ক্ষমতার উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর জমিনে দীন কায়েম।
তিনি বলেছিলেন:
> "আমি কোনো রাজা বা বাদশাহ হতে চাইনি, আমি চাই আল্লাহর শাসন এই ভারতবর্ষে কায়েম হোক।"
---
৪. শাসনকাল: (১৬৫৮ – ১৭০৭)
প্রায় ৫০ বছর দীর্ঘ শাসনকাল—যা মুঘল ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘতম।
তিনি সুন্নি ইসলামকে ভিত্তি করে শরীয়াহভিত্তিক বিচারব্যবস্থা চালু করেন।
ফাহশা ও বিদআত প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়ন করেন।
মদের দোকান, যিনা, সুদ ও প্রকাশ্য গান-বাজনার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন।
---
৫. ইসলাম প্রচার ও কুরআনের খেদমত:
নিজের হাতে পুরো কুরআন লিখে শেষ করেন (আজও তুরস্ক ও হায়দারাবাদে সংরক্ষিত)।
তিনি “ফাতাওয়া-এ-আলমগিরি” নামক বিশাল শরিয়াহ আইন সংকলন করেন—যা হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ রেফারেন্স।
তিনি হাজার হাজার মসজিদ নির্মাণ করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
বাদশাহী মসজিদ (লাহোর)
মোতিজীল মসজিদ (ঢাকা)
---
৬. বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে জিহাদ:
শিবাজি ও মারাঠা বিদ্রোহ দমন করে দক্ষিণ ভারতে ইসলাম কায়েম করেন।
রাজপুত ও সিখদের ষড়যন্ত্র রুখে দেন।
তিনি মন্দির ভেঙেছেন সেই স্থানে, যেখানে মুসলমানদের কুরবানি বা নামাজে বাধা দেওয়া হতো।
ইসলাম বিদ্বেষী দারাশিকো, যিনি কুরআনের বিকৃতি ও হিন্দুদের আকিদা সমর্থন করতেন—তাকে শাস্তি দেন।
---
৭. মৃত্যু ও দাফন:
মৃত্যু: ৩ মার্চ ১৭০৭, আহমেদনগর
নিজের জীবনের শেষ চিঠিতে লিখে যান—
> "আমার কাফনের কাপড় আমি আমার নিজের হাতের উপার্জন থেকে রেখেছি।"
কবর: খুলদাবাদ, অরঙ্গাবাদ – একটি সাধারণ কবর, কোন গম্বুজ বা চূড়া নেই।
---
৮. আওরঙ্গজেবের সভ্যতা ও অবদান:
অবদান বর্ণনা
ইসলামী আইন ফাতাওয়া-এ-আলমগিরি সংকলন করে শরীয়াহ প্রচলন
কুরআন হিফজ ও লেখা নিজের হাতে পবিত্র কুরআন লিখে শেষ করেন
আর্থিক সততা নিজের খরচ নিজের হস্তলিখিত কুরআন বিক্রি করে চালাতেন
দীন প্রতিষ্ঠা হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি, ব্রাহ্মণ্যবাদ ও ভ্রষ্টতা দমন
মসজিদ নির্মাণ হাজারো মসজিদ নির্মাণ, মাদ্রাসা ও ক্বারী নিয়োগ
---
ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন:
আওরঙ্গজেব ছিলেন এক সত্যিকার মুজাহিদ ও ওলী।
যে সময় রাজা-বাদশাহরা বিলাসিতায় ডুবে গিয়েছিল, তিনি ছিলেন আল্লাহভীরু, সুন্নতের অনুসারী এবং ইসলাম কায়েমের জন্য নিঃস্বার্থ কর্মী।
হাদিসে এসেছে:
> "তোমাদের মধ্যে যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে, সে-ই প্রকৃত মুমিন।"
(সহিহ মুসলিম)
---
আমাদের বার্তা:
আজ যারা আওরঙ্গজেবকে 'হিন্দু বিদ্বেষী', 'সাম্প্রদায়িক' বলে গালি দেয়—তারা আসলে ইতিহাসের প্রকৃত সত্য লুকাতে চায়। আওরঙ্গজেব ছিলেন দাজ্জালী সভ্যতার বিরুদ্ধে একজন লড়াকু সৈনিক। তাঁর জীবনী মুসলিম তরুণদের সামনে আলোর দিশা।
লেখকঃ গাজী আমিনুল ইসলাম আল কাসেমী হাঃ
প্রচ্ছদঃ মুহাম্মাদ মুহিব্বুল্লাহ আমিন
---
Publisher: Al-Fatiha Foundation
Platform: Muslim World
#MuslimWorld #মুসলিমবিশ্ব #AlFatihaFoundation #আলফাতিহা_ফাউন্ডেশন #Aurangzeb #IslamicHero #TrueLeader #আলমগীর #AurangzebTheJust

Comments