বাংলাদেশের সম্পদ অমূল্য হীরক খন্ড দরিয়া-ই নূর
.
আলোর নদী বা আলোর সাগর বিশ্বের অন্যতম বড় হীরকখণ্ড, যার ওজন প্রায় ১৮২ ক্যারেট। এটির রং গোলাপি আভাযুক্ত, এ বৈশিষ্ট্য হীরার মধ্যে খুবই দুর্লভ। প্রত্নসম্পদ গবেষকদের মতে, বিশ্বে বড় আকৃতির দুটি হীরকখণ্ড সবচেয়ে মূল্যবান ও ঐতিহাসিক। এর একটি কোহিনূর, অন্যটি দরিয়া-ই নূর। কোহিনূর আছে ব্রিটেনের রানির কাছে এবং দরিয়া-ই নূর ঢাকায় সোনালী ব্যাংকের ভল্টে।
.
হীরার ইতিহাস :
সপ্তদশ শতাব্দীতে দরিয়া-ই নূর অন্ধ্র প্রদেশের মারাঠা রাজার কাছ থেকে হায়দরাবাদের নবাবদের পূর্বপুরুষ ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় কিনে নেন (যখন বাংলাদেশে টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত)। বিভিন্ন হাত ঘুরে অবশেষে এটি পাঞ্জাবের শিখ মহারাজ রণজিত সিংহের হাতে পৌঁছে। তার বংশধর শের সিংহ ও নেল সিংহের হাতে এটি ছিল। ১৮৫০ সালে পাঞ্জাব দখলের পর ইংরেজরা কোহিনূরের সঙ্গে দরিয়া-ই নূরও করায়ত্ত করে। ১৮৫০ সালে প্রদর্শনীর জন্য কোহিনূর ও দরিয়া-ই নূর ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়।
.
হীরকখণ্ড দুটি মহারানি ভিক্টোরিয়াকে উপহার হিসেবে দেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি। পরে মহারানি কোহিনূর নিজের কাছে রাখলেও দরিয়া-ই নূর বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তখন এটি বিক্রির জন্য ভারতে ফেরত আনা হয়। ব্রিটিশ-ভারতীয় সরকার ১৮৫২ সালে দরিয়া-ই নূর নিলামে তুললে ঢাকার ভাগ্যবান জমিদার খাজা আলিমুল্লাহ ৭৫ হাজার টাকায় এটি কেনেন।
.
দরিয়া-ই নূর ঢাকার নবাবরা সাধারণত আনুষ্ঠানিক পোশাক পরিধানকালে বাজুবন্দ হিসেবে ব্যবহার করতেন। নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর এটি নবাব এস্টেটের চিফ ম্যানেজারের তত্ত্বাবধানে চলে যায়। এরপর বহুদিন ধরে কলকাতার হ্যামিল্টন অ্যান্ড কম্পানির হেফাজতে ছিল। প্রতিবছর ফি বাবদ ২৫০ টাকা দিতে হতো নবাবদের। পাকিস্তান সৃষ্টির পর বিভাগীয় কমিশনার এবং রাজস্ব বোর্ডের অনুমতিক্রমে নবাব পরিবারের সদস্য খাজা নসুরুল্লাহর সঙ্গে এস্টেটের ডেপুটি ম্যানেজার বেলায়েত হোসেন কলকাতার হ্যামিল্টন অ্যান্ড কম্পানির কাছ থেকে ১৯৪৯ সালে দরিয়া-ই নূর ঢাকায় নিয়ে আসেন।
.
এরপর ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ঢাকা শাখায় রাখা হয়। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর ঢাকা ইম্পেরিয়াল ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়। তখন দরিয়া-ই নূর রাখা বাক্সটি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের সদরঘাট শাখায় গচ্ছিত রাখা হয়। ৭১-এ বাংলাদেশ সৃষ্টির পর ব্যাংকটির নতুন নামকরণ হয় সোনালী ব্যাংক।
.
সূত্রমতে, নানা অব্যবস্থাপনার কারণে জমিদারি আয় কমে গেলে আর্থিক দৈন্যে পড়েন নবাব সলিমুল্লাহ। হাতি, ঘোড়া, উটের বহরসহ স্থাবর-অস্থাবর অনেক সম্পত্তি তিনি বিক্রি করে দেন। তাতেও না কুলালে তিনি ঋণ নেন। ১৯০৮ সালে নবাব সলিমুল্লাহ তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রেখে ৪১৪২ নম্বর দলিলমূলে ৩ শতাংশ সুদে ৩০ বছরের মধ্যে পরিশোধের শর্তে ১৪ লাখ রুপি ঋণ নেন। কিন্তু এ ঋণ নবাব পরিবার পরিশোধ করেনি বিধায় এ হীরকখণ্ডটিসহ ঢাকার নবাবদের অন্যান্য অলংকার ও মূল্যবানসামগ্রী সোনালী ব্যাংকেই রক্ষিত আছে।
.
কমিটি সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৪ সালে হীরকখণ্ডটি নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার চেষ্টা করে জাতীয় জাদুঘর। সে সময় ভূমি মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে প্রায় ৬০ বছর পর এর মূল্য নির্ধারণ করে ৫ লাখ টাকা। কিন্তু জাদুঘর সেটি সংগ্রহ করতে পারেনি। সর্বশেষ ১৯৮৮ সালে দরিয়া-ই নূরের গুণগতমান যাচাই, মূল্য নির্ধারণ এবং জাদুঘরে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদসচিবকে সভাপতি করে একটি কমিটিও গঠন করেছিল সরকার। কিন্তু সে কমিটি কোনো ফলপ্রসূ ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এর আগে ১৯৮৫ সালে নবাব পরিবারের বিই প্রপার্টির মালিকের পক্ষ থেকে হীরকটির বিশুদ্ধতা যাচাই এবং পরিমাপ গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। এ জন্য উটাহ জেমোলজিক্যাল সার্ভিস কম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা পরীক্ষা করে হীরকটির অকৃত্রিম বিশুদ্ধতা পেয়েছিল। কিন্তু এখন মহামূল্যবান হীরকখণ্ডটি সোনালী ব্যাংকের ভল্টে আছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে অনেকের মধ্যে।
.
হীরা ও ঋণ পরিশোধঃ
১১২ বছর আগে নেওয়া ঋণ আজও পরিশোধিত হয়নি ফলে সেই সম্পদও হয়ে গেছে সরকারী সম্পত্তি। ভূমি সংস্কার দপ্তরের বিভিন্ন রিপোর্ট ও চিঠিপত্র থেকে এই বিপুল রত্নভান্ডারের সম্বন্ধে বেশ কিছু তথ্য জানা গেছে যদিও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এবিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বছর চারেক আগে ২০১৬ সালে এই রত্নভান্ডারের পরিদর্শনের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয় যদিও তার পরবর্তী কার্যকলাপের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। এর প্রায় পাঁচ বছর আগে ২০১১ সালে আরও একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ভূমিমন্ত্রীর দপ্তর থেকে। সেই কমিটির সামনে একটি সিল করা বাক্স পেশ করা হয়েছিল যার ভিতরে সমস্ত রত্ন ছিল। কিন্তু সেই বাক্স খোলা হয়নি তাই জানাও যায়নি নবাব সলিমুল্লাহর সম্পদের বিবরণ।
তথ্যসূত্র :বাংলাপিডিয়া, দৈনিক কালের কণ্ঠ, সালাম ওয়েব,বাংলা নিউজ ২৪।
.
লিখেছেন: শামীম আনোয়ার

Comments