Skip to main content

গরু জবাইয়ের রাজনৈতিক ইতিহাস


 গরু জবাইয়ের রাজনৈতিক ইতিহাস

_______________________________________


"শি'য়ার" আরবী শব্দ, এর শাব্দিক অর্থ চিহ্ন বা বিশেষ কোন আলামাত। কুরআন এবং হাদীসের দৃষ্টিতে শি'য়ার হলো,কোন জাতীর এমন বিশেষ নিদর্শনকে বলে যা দেখলেই বুঝে আসে যে এটি অমুক ধর্মের।


আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. বলেন,

"শি'য়ারের আলোচনা শুধু ঐ বিষয়গুলোতে হবে যেগুলোর ব্যাপারে শরীয়ত প্রণেতার পক্ষ থেকে কোন বাধা আসেনি। অন্যথায় শরয়ীত কর্তৃক নিষিদ্ধ সকল বিষয় থেকে বেঁচে থাকা তো জরুরী। চাই তা কোন জাতীর নিদর্শন হোক বা না হোক। এছাড়া যে সকল বিষয়গুলোর ব্যাপারে শরীয়তে নিষিদ্ধ করা হয়নি। কিন্তু তা অন্য কোন জাতীর নিদর্শন তাহলে তা থেকে বেঁচে থাকা মুসলিমদের জন্য জরুরী। যদি তারা বেঁচে না থাকে এবং তাদের নিদর্শনটি অন্যদের মত ব্যাপকতা লাভ করে।এমনকি ঐ যুগের নেককার এবং আলেম উলামারাও তা করতে থাকে তাহলে নিষিদ্ধতার কঠোরতা থাকবে না।"[১]


ইসলামে গরু জবাই বা গরুর গোশত হালাল হওয়ার বিষয়টি সাধারণ হালালের মতো নয়; বরং এটি হলাল হওয়ার বিষয়টি 'কাতয়ি' ভাবে প্রমাণিত। 


হাদীস শরীফে এসেছে,


‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যিল-কা‘দাহ মাসের পাঁচ দিন বাকী থাকতে আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে রওয়ানা হলাম। হাজ্জ আদায় করা ব্যতীত আমাদের অন্য কোন ইচ্ছা ছিল না। যখন আমরা মক্কার কাছাকাছি পৌঁছলাম, তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করলেনঃ যার সাথে কুরবানীর জানোয়ার নেই সে যেন বাইতুল্লাহর তাওয়াফ এবং সাফা-মারওয়ার সা‘ঈ করে হালাল হয়ে যায়। ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) বলেন, কুরবানীর দিন আমাদের কাছে গরুর গোশ্ত আনা হলে আমি বললাম, এ কী? তারা বলল, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ হতে কুরবানী করেছেন।[২]


আয়িশাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা একমাত্র হজ্জের উদ্দেশে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে রওনা হলাম। আমরা সারিফ নামক স্থানে বা এর কাছাকাছি পৌছলে আমার মাসিক ঋতু শুরু হয়ে যায়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট এলেন এবং আমি তখন কাঁদছিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি হায়য হয়েছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলা এটা আদম (আঃ) এর কন্যাদের জন্য নির্ধারিত করে দিয়েছেন। অতএব তুমি হাজ্জের (হজ্জের/হজের) যাবতীয় অনুষ্ঠান পূর্ণ কর, শুধু (হায়যকাল শেষ হবার পর) গোসল না করা পর্যন্ত বায়তুল্লাহ তওয়াফ করবে না। আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সহধর্মিণীগণের পক্ষ থেকে গরু কুরবানী করেন।[৩]


নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী মা ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজে (হজ্জে) তাঁর পরিবারের পক্ষ হতে একটি গাভী কুরবানী করেছেন।[৪]


ইসলামী শরিয়তে কিছু হালাল-হারামের বিষয় রয়েছে যেগুলো ইখতিলাফি। যেমন: কাঁকড়া — হানাফি মাযহাবে এটি মাকরূহে তাহরিমি, আর অন্যান্য মাযহাব মতে এটি হালাল বা জায়েজ। এই ইখতিলাফ দ্বারা কুফরে 'ইসতিহলাল' হয়ে যায় না। আবার যেমন: জর্দা — এটিও হারাম (মাকরুহে তাহরিমি) এটিকে কেউ হালাল বললে কুফর হবে না। কেননা এটি হারাম হওয়ার বিষয়টি 'মুতাওয়াতির নস' দ্বারা প্রমাণিত না। কিন্তু অন্য দিকে গরুর গোশত হালাল হওয়ার বিষয়টি সকল মাযহাবের ইমাদের মতে হালাল অর্থাৎ 'তাওয়াতুর আমালি' এটি 'কাতয়ি' ভাবে প্রমাণিত।


গরু কোরবানী উপমহাদেশে মুসলমানদের, মুসলমানিত্বের প্রতীক, ইসলামের শি'য়ার।


হাকিমুল উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি গরু কোরবানীর সংস্কৃতি ইসলামের প্রতীকী ইবাদত বলে বিশ্বাস করতেন বিধায় তিনি কোরবানী গোশত খাওয়াকে সওয়াবের কাজ বলতেন। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে ভারতীয় মুসলমানের ঐতিহ্য নিয়ে বেঁচে থাকা তিনটি কাজের উপর নির্ভরশীল। প্রধানত নামায, দ্বিতীয়ত মুসলিম বুযুর্গ ও মনীষীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, তৃতীয়ত গরু কোরবানী।[৫]


মুজাদ্দিদে আলফেসানী ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী রহ. কোরবানীকে ইসলামের পরিচয়বাহী ইবাদত মনে করতেন। তিনি একটি চিঠিতে লিখেন: "বর্তমান প্রেক্ষিতে ভারতীয় মুসলমানদের গরু কোরবানী করা মুসলমানের পরিচয়বাহী' শিয়ারে-ইসলাম"।[৬] এবং এসবের নজির রেখে গেছেন আমাদের আকাবির আসলাফগণ। 


সময়টা সম্ভবত ১৩শতকের শেষ দিকে, সিলেট শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পূর্ব-পূর্ব-দক্ষিণে সুরমা নদীর উত্তর তীরে এবং নদী থেকে প্রায় ২৯৭ মিটার উত্তরে একটি নির্জন স্থানে একটি মাজারর আছে। সৈয়দ বুরহান উদ্দীন রহ. এর মাজার।


গ্রামের নাম টুলটিকর, প্রকাশ্যে কুলীঘাট। নদীর পাড় ঘেঁষে যে পাকা সড়ক পূর্বদিকে চলে গেছে, তা থেকে একটি গ্রাম্যপথ উত্তর দিকে চলে গেছে। সে পথের পশ্চিম পার্শ্বে অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালে নির্মিত এ মাজার। 


স্থানীয় অধিবাসীদের মতে এ মাজার অত্যন্ত প্রাচীন, বর্তমান সিলেট জেলার প্রাচীনতম মাজার। সিলেটের প্রথম মুসলমান যিনি নিজের ছেলের আকিকার জন্য গরু জবেহ করেছিলেন।সৈয়দ বুরহান উদ্দিন রহ. ছিলেন সিলেটের প্রথম মুসলিম যিনি স্বীয় আওলাদের আকিকার জন্য গরু জবেহ করেছিলেন। এবং সেই তথাকথিত অপরাধে সিলেটের রাজা গৌড়গোবিন্দ যাঁর পুত্রকে হত্যা করেছিলেন। 


সে সময় বর্তমান সিলেট তৎকালীন শ্রীহট্টের জালিম শাসক ছিলো এই গৌড় গোবিন্দ। সে জালিমের শাসনামলে সে রাজ্যে গরু জবাই এবং কোরবানী নিষিদ্ধ হওয়ায় সৈয়দ বুরহান উদ্দীন রহ. তিনি কিছু গোশত গ্রহনের পর পুরোটাই মাটির নিচে চাপা দিয়ে দেন।


অত্যাচারী শাসকের জন্য তিনি অন্য কাউকে গরুর গোশত দেননি কারন সে অত্যাচারী গৌড় গোবিন্দ যদি টের পেয়ে যায় তাহলে যাকে গোশত দেওয়া হবে তার ‍উপরও নির্মম অত্যাচার চালাবে। আর এ কারনেই তিনি বাকি গোশত মাটির নিচে চাপা দিয়ে দেন। যাতে করে গৌড় গোবিন্দ টের না পায়।


কিন্তু একটা কাক গর্ত থেকে একটা হাড্ডি বের করে গোবিন্দের যাত্রাপথে ফেলে দিলো। মনে করা হয় এটাই ছিল বাংলায় মুসলমানদের আনুষ্ঠানিকভাবে আবির্ভাবের পটভূমি। সে অত্যাচারী গৌড় গোবিন্দ কাফের শাসক ক্ষিপ্ত হয়ে সৈয়দ বুরহান উদ্দিন রহ. উনার পরিবারকে ডেকে পাঠালেন। মা ও বাবার সামনে সৈয়দ বুরহান উদ্দিন রহ. উনার একমাত্র সন্তানকে জবাই করে অত্যাচারী শাসক গৌড় গোবিন্দ। এবং সেই সাথে অত্যাচারী চরম জালিম গৌড় গোবিন্দ সৈয়দ বুরহান উদ্দিন রহ. উনার হাত কেটে দেয়। (নাউজুবিল্লাহ!)


খৃষ্টীয় ১৩০১ সনে সুলতান রুকনুদ্দীন কাইকাউসের ইন্তিকাল হলে শামসুদ্দীন ফিরোজশাহ লাখনৌতির সুলতান হন।


বুরহান উদ্দিন তৎকালীন বাংলার  শাসক  সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহের সাথে দেখা করে  এই নির্মম ঘটনা জানান।


সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজশাহ সেনাপতি সিকান্দার গাজীর নেতৃত্বে একদল সৈন্য প্রেরণ করেন গৌরগোবিন্দের বিরুদ্ধে। দুইবার হামলা চালিয়েও সিকান্দার গাজী তাঁকে পরাজিত করতে পারেননি। পরে অন্যতম সেনাপতি সাইয়েদ নাসিরুদ্দীন তাঁর হাত শক্তিশালী করেন। তদুপরি ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুবাল্লিগ শাহ জালাল তাঁর তিনশত জন সাথী নিয়ে মুসলিম বাহিনীতে যোগদান করেন। আবারো সামরিক অভিযান পরিচালিত হয় গৌর গোবিন্দের বিরুদ্ধে। পরাজিত হয়ে গৌর গোবিন্দ গহীন জংগলের দিকে পালিয়ে যান।[৭]


সিলেটে মুসলিম অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বলা যায় যে, গৌড়ের সুলতান শামস উদ্দীন ফিরোয শাহর আমলে ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে এ ঘটনা ঘটে। হযরত শাহজালাল মুজাররাদ রহ.

সেই অভিযানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় এবং তাঁরই সাধনায় ও চরিত্র-মাহাত্ম্যে সমগ্র জেলায় ইসলাম ধর্ম ব্যাপকভাকে প্রচলিত হয়।[৮]


বাবা আদম শহীদকে রহ. বলা যায় এই জমিনের প্রথম মুজাহিদ। আরবের পবিত্র মক্কা নগরের অদূরে তায়েফে ১০৯৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন ইসলাম ধর্ম প্রচারক বাবা আদম। পরবর্তী সময়ে আধ্যাত্মিক জ্ঞান সাধনায় বড় পীর হজরত আবদুল কাদের জিলানী রহ.-এর সাহচর্য পেতে বর্তমান ইরাকের বাগদাদে আসেন। সুদূর আরব দেশে জন্মগ্রহণ করে ইসলাম ধর্ম প্রচারে ভারতবর্ষে এসেছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক বাবা আদম রহ.। তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে খানকাহ নির্মাণ করে ইসলাম প্রচার করেন। বাবা আদম শহীদ রহ. ১১৪২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে আসেন। সেখান থেকে ১১৫২ খ্রিষ্টাব্দে মুন্সীগঞ্জ সদরের প্রাচীন রামপালনগরে আসেন। মুন্সীগঞ্জ এলাকার কপালদুয়ার, মানিকেশ্বর ও ধীপুরে তিনটি খানকাহ নির্মাণ করে ইসলাম প্রচার করেন।’ উপমহাদেশে সেন শাসনামলে ১১৭৮ সালে ধলেশ্বরীর তীরে মুন্সীগঞ্জের মীরকাদিমে আসেন তিনি। তখন বিক্রমপুর তথা মুন্সীগঞ্জ ছিল বল্লাল সেনের রাজত্ব।[৯]


বল্লাল সেন কর্তৃক বিক্রমপুরস্থ রামপালের জনৈক মজলুম মুসলমানের প্রতি অত্যাচার করতেন। প্রতিকারার্থে এই মহাপুরুষ মক্কা থেকে সাত হাজার শিষ্যসহ এখানে আগমন করেন। তিনি রামপালের নিকট আবদুল্লাহপুরে তাঁর আস্তানা স্থাপন করেন এবং গরু জবেহ করেন। এ সংবাদ পেয়ে বল্লাল সেন বল্লালবাড়ি নামে পরিচিত তাঁর রাজধানী থেকে আব্দুল্লাহপুরের দিকে অগ্রসর হন। তিনি বাবা আদমের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন। বাবা আদম তখন তাঁর নিজের তরবারি রাজাকে সমর্পণ করেন এই বলে যে, তাঁর তরবারি দিয়েই কেবল তাকে হত্যা করা যেতে পারে। বল্লাল সেন তখন ঐ তরবারি দিয়ে বাবা আদমকে শহীদ করেন। বাবা আদম শহীদের মৃত্যুর পর বল্লাল সেন অবশ্য বেশিদিন বেঁচে থাকেন নি। ভাগ্যের পরিহাসে রাজাও সপরিবারে অগ্নিকাণ্ডে ঝাঁপ দিয়ে জীবন বিসর্জন করতে বাধ্য হন।[১০][১১]


হিন্দু জমিদাররা তাদের জমিদারিতে গরু কোরবানী নিষিদ্ধ করেছিলেন। তখন ঢাকার নবাব পরিবারই শুধু মাত্র গরু কোরবানী করতে পারতো। এমনকি ঢাকার নবাব পরিবার নিজেদের সক্ষমতা প্রকাশ করার শবে-বরাতে গরু জবাই করতেন। এছাড়া আর কোথাও গরু জবাই হতো না। সবাই তখন ছাগল কোরবানী দিতো। তাই তখন ঈদুল আজহা 'বকরির ঈদ' হিসাবে প্রসিদ্ধ লাভ করে। বস্তুত সেদিন হিন্দু জমিদাররা তাদের জমিদারিতে একপ্রকার হিন্দু রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। হিন্দু জমিদাররা গরু কোরবানী করলে মুসলমানদের উপর নানা রকম নির্যাতন করতেন। রবীন্দ্রনাথের পরিবারের লোকজনও ছিলেন খুবই অত্যাচারী। তারা তাদের জমিদারিতেও গরু কোরবানী নিষিদ্ধ করেছিলেন।[১২] 


১৮৮২ সালে দায়নন্দ সরস্বতী ভারতে "গো হত্যা নিবারনী" সভা স্থাপন করলে শুরু হয়েছিল বিতর্ক। 'গো হত্যা' বা গরু কোরবানীর বিপক্ষে এ সভা থেকে ভারত জুড়ে হয়েছিল প্রবল প্রচার। ১৮৮৭ সালে রাজশাহীর তাহিরপুরের জমিদার শশিশেখর রায় কংগ্রেস মাদ্রাজ অধিবেশনে এ পরিপ্রেক্ষিতে উত্থাপন করেছিলো প্রস্তাব। ফরিদপুর ও বিভিন্ন অঞ্চলেও এ নিয়ে প্রচার শুরু হয়েছিল।[১৩] তখন এর বিরোধিতা করতে মুসলমানদের বিভিন্ন সভা বা আঞ্জুমান সমূহ এগিয়ে এসেছিল। বিত্তবান হিন্দুদের এ প্রচারনার সমর্থনে এসেছিল স্থানীয় হিন্দু জমিদাররা। ঐ সময়কার অবস্থার একটি বিবরণ পাওয়া যাবে ইবনে মাযুদ্দিন আহমদের আত্মজীবনী 'আমার সংসার জীবন'-এ। তিনি লিখেছেন:


গোবিন্দপুর, হরিশঙ্করপুর, সনাতন, গোপীনগর, আমলা, গোসাঞ্জী পুকুর প্রভৃতি কতকগুলি গ্রাম একজন প্রচণ্ড প্রতাপান্বিত বড় হিন্দু জমিদারের জমিদারী ভূক্তি; সেখানকার মুসলিমগণ বহুকাল অবধি গরু কোরবানী করতে বা গরু জবেহ ও উহার গোসত ভক্ষণ করিতে পারিত না। কেহ করিলে তার আর রক্ষা ছিল না। জমিদার কাছারীর দুর্দান্ত হিন্দু নায়েবগণ কোরবানী দাতা ও হত্যাকারীকে ধরিয়া আনিয়া প্রহার ও নানা অপমান করিত এবং তাহাদের নিকট জরিমানা আদায় করিত। সুতরাং তাহাদের অত্যাচারে ঐ অঞ্চল হইতে গো কোরবানী প্রথা উঠিয়া গিয়াছিল।[১৪]


বিখ্যাত সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদের লেখা: 'বকরা ঈদে গরু কোরবানী কেউ করিত না। কারণ জমিদারের তরফ হ‌ইতে উহা কড়াকড়িভাবে নিষিদ্ধ ছিল। খাশি-বকরি কোরবানি করা চলিত। লোকেরা করিত‌ও তা প্রচুর।' 'জমিদারের তরফ হ‌ইতে উহা কড়াকড়িভাবে নিষিদ্ধ ছিল' বিধায় বাংলার মুসলমানরা সাধারণত বকরি কোরবানি করতো। যে কারণে ঈদের নাম‌ই হয়ে গিয়েছিল বকরি ঈদ।[১৫]


অসাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালী জাতির গৌরব, বাঙালী ঈশা খাঁ ফেলে মারাঠী শিবাজী বন্দনায় মেতে উঠেছিলেন, 'গো-ব্রাহ্মণ প্রতিপালক' শিবাজীর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রমাণের উদ্দেশ্যে তার জমিদারীতে গরু কোরবানী নিষিদ্ধ করেছিলেন। একটি ভারতীয় দৈনিকের ২৮ মে ১৯৯০ সংখ্যায় প্রকাশিত উপসম্পাদকীয় উদ্ধৃতি: 


"কিন্তু শিলাইদহ জমিদারী এলাকায় যেখানে প্রায় সকল রায়তই ছিল মুসলমান, সেখানে গরু কোরবানী নিষিদ্ধ করা কিংবা একতরফাভাবে খাজনা বাড়িয়ে মুসলিম প্রজাদের প্রতিরোধের মুখে আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে তাদের শায়েস্তা করার জন্য তাদের গ্রামে হিন্দু (নমশূদ্র) প্রজাপত্তন করার ঘটনা নিশ্চয়ই কোনও উদার অসাম্প্রদায়িকতার প্রমাণ বহন করেনা।"[১৬]


১৯১০ সালের সংবাদে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশে গরু কোরবানীতে বাধা দিচ্ছে হিন্দু জমিদাররা। 'বাসনা' লিখেছিল:


অনেক জমিদার মহাশয় কলকাতা গ্রেট ইস্টার্ণ হোটেলে কাবাব খাইতে পারে। কিন্তু আপন জমিদারী মধ্যে মুসলমান প্রজাদিগকে তাহাদিগের ধর্মকার্য্য (কোরবানী) করিতে দেন না। এই শ্রেণীর জমিদার মহাশয়গণ যতদিন তাহাদিগের অন্তঃকরণে প্রশস্ত না করিয়া মুসলমান গরীব প্রজাদিগকে তাহাদিগের ধৰ্ম্মকার্য্য প্রকাশ্যভাবে করিতে অনুমতি না দিবেন, ততদিন ঐক্য স্থাপিত হইবে না।[১৭]


১৮৯৫-এর দিকে জানা যায়, ময়মনসিংহের অম্বরিয়া, মুক্তাগাছা ও সন্তোষের জমিদার ঈদ-উল আজহায় গরু কোরবানী করার জন্য বেশ কিছু মুসলমানকে মোটা অংকে জরিমানা করেছিলেন।[১৮]


১৯০৫' সালে চাঁদপুর জেলায় কয়েকজন মিলে  গরু কোরবানী দিয়েছিলো। এর ফলে 'গোপাল চন্দ্র মজুমদার' নামে এক হিন্দু লোক মামলা করে তিনজনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ ছিল মুসলমানরা প্রকাশ্যে গরু কোরবানী দিয়েছে এবং মাংশ ধুয়ে জল অপবিত্র করেছে। জেলা হাকিম ছিলেন 'জগদীশচন্দ্র সেন' তিনি তিনজন মুসলমানকে অভিযুক্ত করে একজনকে জেল ও বাকি দুইজনকে বড় অঙ্কের অর্থ জরিমানা করেন।[১৯]


প্রখ্যাত সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন গরু কোরবানীর (গো-হত্যা) বিপক্ষে হিন্দুদের পক্ষ অবলম্বন করলেন। বিতর্কে মুসলমানদের পক্ষ নিয়েছিলেন 'আখবারে এসলামীয়া' সম্পাদক মাওলানা নঈমুদ্দীন রহমাতুল্লাহি আলাইহি। 


ঈদ-উল আজহায় গরু কোরবানী না করলেও কেন চলবে তার পক্ষে যুক্তি দিয়ে লিখেছিলেন মীর মশাররফ হোসেন 'গো-জীবন' গ্রন্থে-"ধর্মে আঘাত লাগে না, গো-মাংস পরিত্যাগ করিলে ঘরকন্যারও ব্যাঘাত জন্মে না। উন্নতির পথেও কাঁটা পড়ে না। প্রাণের হানি কি? পরিত্যাগে নিজের কোন ক্ষতি নাই, অথচ চির সহযোগী ভ্রাতার মনরক্ষা, ধর্মরক্ষা আর যাহা রক্ষা তাহা বারবার বলিব না?... সাধারণে জানে যে 'ঈদজ্জহায়' গরু কোরবানী না করিলে ধৰ্ম্ম বজায় থাকে না, মোসলমানিত্ব রক্ষা পায় না এটা সম্পূর্ণ ভুল। মীর মশাররফের এসব দালালির বিপক্ষে মুসলমানদের পক্ষ থেকে এগিয়ে আসেন মাওলানা নঈমুদ্দীন রহমাতুল্লাহি আলাইহি।তিনি ছিলেন টাঙ্গাইল থেকে প্রকাশিত মাসিক 'আখবারে এসলামীয়া'র সম্পাদক। এক জনসভায়, মীর মশাররফকে 'কাফের' এবং তাঁর 'স্ত্রী হারাম' বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। 'আখবারে এসলামীয়া' নিয়েছিল এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা।[২০]


১৯২৫ সালে এ প্রশ্ন তুলেছিলেন একটি পত্রিকায় জনৈক 'রওশন হেদায়েৎ'-"মুসলমান কখনও হিন্দুর দুর্গা পূজায় বাধা দেয় না, কিন্তু মুসলমানদিগের গো কোরবানীতে হিন্দু প্রজাদের মাথা বিগড়ায় কেন?"[২১] ন্যায্য প্রশ্ন, কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার আগে এর সন্তোষজনক মীমাংসা হয়নি। ১৯৩০ সালেও দেখি, আকরম খাঁর প্রভাবশালী 'মোহাম্মদী'তে কোরবানীর পক্ষে, 'সঞ্জীবনী' বিপক্ষে লেখা হচ্ছে। তবে, হিন্দু মালিকানাধীন কিছু পত্র-পত্রিকায় গরু খাওয়া যে হিন্দুদের ধর্মবিরোধী নয়, বরং সংস্কার, এ বক্তব্য যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছিল।


১৯০১ সালে 'মোহাম্মদী'তে 'আলোচনা' বিভাগে মওলানা আকরম খাঁ প্রথমে ঐ ধরনের একটি পত্রিকা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন- "মুসলমানরা যেরূপ বকরী ঈদ উপলক্ষে গো- কোরবানী করেন, সত্য ত্রেতা দ্বাপর যুগের আর্যরাও ঠিক সেই ভাবে 'গো-মেধ যজ্ঞ' পালন করিতেন। বকর ঈদ আর 'গো-মেধ যজ্ঞ' প্রায় সমঅর্থবাচক শব্দ। তবে কোন দোষযুক্ত গরু কোরবানী করা চলিবে না মুসলমানদের ধর্মশাস্ত্রের তাহার যেরূপ মছলা আছে, হিন্দু শাস্ত্রেও তাহার অনুরূপ ব্যবস্থা দেখিতে পাওয়া যায়।"


এরপর লিখেছিলেন আকরম খাঁ-"এদেশের গো মাংস চলিবে না' বলিয়া সহযোগী যে চরম মন্তব্য পেশ করিয়াছেন, অবস্থা গতিকে তাহার সমর্থন আমরা করিতে পারিতেছি না। কারণ, এখন এদেশে গো মাংস বেশ সচল হইয়া আছে। মুসলমান ও খৃষ্টানের কথা ছাড়িয়া দিলেও, হিন্দু জাতির বহু শাখা প্রশাখার মধ্যে আজও যথেষ্ট প্রচলন আছে। বকর ঈদের সময় গো-মেধ যজ্ঞের প্রসাদ লাভের জন্য এই শ্রেণীর শত শত নর-নারী মুসলমান পল্লীগুলিতে ঘুরিয়া বেড়ায়। প্রধানত এই গো-খাদক হিন্দুরাই আজ মহাত্মা গান্ধীর পরিভাষায় 'হরিজন' বিশেষণ লাভকরিয়াছে। উচ্চ স্তরের হিন্দুদিগের, এমনকি হিন্দু সভার নেতৃবর্গের মধ্যে গো-খাদক হিন্দুর যে একেবারেই অভাব কোন সত্যনিষ্ঠ হিন্দুই বোধ হয় একথা জোর করিয়া বলিতে পারিবেন না। সুতরাং এদেশে এখনই যখন গো মাংসের প্রসার এতটা বিদ্যমান আছে এবং উচ্চস্তরের শিক্ষিত হিন্দুরা যখন বেদাদি প্রকৃত হিন্দুশাস্ত্র ও প্রাচীন যুগের ব্যবহার হইতে গো কোরবানীর ও গো মাংস ভক্ষণের বৈধতা সপ্রমাণ করিতে এতটা আগ্রহ প্রকাশ করিতেছেন, তখন 'এদেশে গো মাংস চলিবে না'-বলিয়া চরম ঘোষণা প্রচার করা সহযোগীর পক্ষে সঙ্গত হইয়াছে বলিয়া মনে হয় না।"[২২][২৩]


উপনিবেশিক বাংলায় এই অবস্থা বহুদিন ধরে চলেছে। গরু কোরবানী নিয়ে হিন্দু-মুসলমান বিরোধ তীব্রতর হয়েছে। সিলেট রেফারেন্ডামের সময় কংগ্রেসের নেতারা শ্লোগান তুলেছিলেন 'হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই'। তখন শেখ মুজিবুর রহমান মুসলমানদের মিছিলে শ্লোগান দিয়েছিলেন 'হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই/ চলো দু'য়ে মিলে গরু খাই'। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে রীতিমতো গরু জবাই হয়েছিল এবং তিনি স্থানীয় কংগ্রেসের হিন্দু নেতাদের সেখানে দাওয়াত দিয়েছিলেন।[২৪] আজকের প্রেক্ষিতে এ ঘটনাটি 'অন্যরকম' মনে হলেও মুসলিম লিগ নেতা শেখ মুজিব এটা কোনোভাবেই সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যে করেন নি। তখনকার সামাজিক পরিস্থিতিতে তিনি এটা করেছিলেন মুসলিম আত্মপরিচয়ের সাংস্কৃতিক দিকটি তুলে ধরতে, যাতে নিপীড়িত মুসলমানদের আত্মবিশ্বাস কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পায়।


পাকিস্তান হবার পরও গরু কোরবানী নিয়ে কম ঝামেলা হয় নি। প্রভাবশালী হিন্দুদের এলাকায় মুসলমানরা গরু কোরবানী দিতেন না এবং ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলের ব্যবস্থাটাকেই তারা একরকম মেনে নিয়েছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে ছোট্ট শহর নাটোরের এসডিও পি এ নাজির সেখানে কীভাবে গরু কোরবানী নতুন করে শুরু হয় তার একটি কাহিনী লিখেছেন:


...মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, 'শহরে গরু কোরবানী হয় কিনা এবং হলে কি রকম হয়, খুব ধুমধাম করে হয় নাকি?' জবাবে তিনি বললেন, 'এটাতো রানী ভবানীর শহর, এখানে গরু কোরবানী হয় না। যারা পারে ছাগল, ভেড়া কোরবানী করে। গ্রামের দিকেও তেমন একটা শোনা যায়না কোরবানীর কথা।' সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনার কি মতলব?' তিনি একটু বেকায়দায় পড়ে গেলেন সত্য। কিন্তু তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে বললেন, 'ইনশাআল্লাহ, আমি কোরবানী দেব। ঈদের দিন সন্ধ্যায় আমার বাড়ী আপনাকে আসতে হবে।' ধন্যবাদ জানালাম তাঁকে দাওয়াতের জন্য।


...সন্ধ্যায় চেয়ারম্যান সাহেবের বাসায় দাওয়াত খেতে গেলাম। চেয়ারম্যান সাহেব বিজয়ের সুরে বললেন তেবাড়িয়ার হাট থেকে নিজে গিয়ে গরু কিনে এনেছেন। জিজ্ঞেস করলাম, 'জবাই দিলেন কোথায়?' বেচারা একটু সুর নিচু করে জবাব দিলেন, 'কি করবো স্যার- বাড়ীর উঠানে জবাই দিয়েছি।' বললাম, 'সর্বনাশ, এখানে আপনার একটা গরু শোয়ানর মত জায়গা কোথায়?' বললেন, 'কি করবো স্যার? সবদিক দেখেই তো চলতে হয়।' বললাম, 'আপনি খুব ভাল কাজ করেছেন। অন্যান্যের জন্যে দৃষ্টান্ত হবে এটা। নিজের বাড়ীর লোকদের কষ্ট হলেও অন্যের মনে যাতে আঘাত না লাগে সে কাজই আপনি করেছেন।' নানা আলাপ আলোচনার মধ্যে হঠাৎ চেয়ারম্যান সাহেব আমার কানের কাছে মুখ এনে বললেন, 'আমার স্ত্রী বলেছেন বাড়ীর ভিতর গরু জবাই দেয়া হল কোন অমঙ্গল হবে না তো?' কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলাম, 'প্রশ্নটা আপনার স্ত্রীর না আপনার?' 'না স্যার, আমি তো এসব পাত্তাই দেই না।' বললাম, আপনার স্ত্রীকে বলবেন, এসডিও সাহেব বলেছেন এ বাড়ীতে যেসব ভূত-প্রেত এতদিন ছিল, আজকের এই গরু কোরবানীর পর সব এই মহকুমা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। আর কোন দিন তারা আসবে না।[২৫]


এ কাহিনী অবিশ্বাস্য মনে হলেও সেদিনের প্রেক্ষিতে এটাই ছিল বাস্তব। এ ঘটনাটিকে ইংগিত করে মুনতাসীর মামুন লিখেছেন:

আজকে আমরা ঈদ-উল-আজহায় অনায়াসে গরু (বা অন্য কিছু) কিনে এনে সহজেই কোরবানী দিয়ে ফেলি। আশি একশো দূরে থাকুক পঞ্চাশ বছর আগেও তা তেমন সহজসাধ্য ছিল না। আজকের প্রজনন্ম হয়ত অবাক হবে যে, এ নিয়ে সুদীর্ঘ পঞ্চাশ বছর বিতর্ক চলেছে এবং কোরবানী বিশেষ করে গরু কোরবানী দেওয়ার অধিকার আমাদের বাপ দাদাদের লড়াই করে আদায় করতে হয়েছিল।[২৬]


১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে অল ইণ্ডিয়া মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা সমাবেশে বক্তৃতাকালে নওয়াব ওয়াকারুল মুলক তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, 'অচিরেই মুসলমানদের উপর এমন এক জাতি শাসক হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে, যারা সংখ্যার দিক থেকে আমাদের চেয়ে চারগুণ বেশী। ভাইয়েরা সেই মুহূর্তটি আসার আগে আমাদের প্রত্যেকের চিন্তা করা উচিত তখন আমাদের অবস্থা কেমন হবে! তখন আমাদের জীবন, সম্পদ, ইজ্জত, সম্মান সবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে। বর্তমান বৃটিশ শাসকরা ক্ষেত্র বিশেষে আমাদের নাগরিকদের হিফাযত করছে, তদুপরি আমাদের বন্ধুরা (!) আমাদের উপর যে জুলুম অত্যাচার চালাচ্ছে এর চিহ্ন কমবেশী সব প্রদেশেই বিদ্যমান। হায় আফসোস! সেই সময়ের জন্য যখন ওরা আমাদের উপরে আওরঙ্গজেবের প্রতিশোধ নিতে শুরু করবে। এরা শত বছর পর হলেও মোগল শাসনের প্রতিশোধ আমাদের উপর দিয়ে চালাবেই চালাবে।[২৭]


ওয়াকারুল মুলকের ভবিষ্যদ্বাণী কংগ্রেসের দু'বছরের শাসনামলে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়েছিল। তখন হিন্দুরা মুসলমানদের তহযীব, তমদ্দুন, সাহিত্য সংস্কৃতি, ভাষা ও মাযহাব বিকৃত ও ধ্বংসের জন্যে সম্ভাব্য কোন চেষ্টারই ত্রুটি করেনি।

১৯৩৫ সালের বৃটিশের ভারত শাসন আইনের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ছয়টি প্রদেশে কংগ্রেস সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এসব প্রদেশের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর কংগ্রেস প্রথমেই উর্দু ভাষা রহিত করার জন্যে অপচেষ্টা চালায়। সেই সাথে মন্দির পুনঃপ্রতিষ্ঠা স্কীম ও পল্লী উন্নয়ন স্কীমের আওতায় মুসলিম নিধন আইন জারি, গো-হত্যা বন্ধ করে। সে সময় মুসলমানদের উপর কী ভয়াবহ জুলুম অত্যাচার হয়েছে সিয়ারপুর রিপোর্ট, শরীফ রিপোর্ট, পীরপুর রিপোর্ট সেই সব জুলুম অত্যাচারের প্রামাণ্য দলীল। সেই দু'বছরের কংগ্রেসের শাসনে মুসলমানরা এই পরিমাণ ক্ষুব্ধ ও যন্ত্রণাকাতর ছিল যে কংগ্রেস সরকারের মন্ত্রীত্বের পদ থেকে মুসলমানরা যখন পদত্যাগ করেন তখন কায়েদে আযমের পরামর্শে মুসলমানরা ১৯৩৯ সালের ২২ ডিসেম্বর মুক্তি দিবস পালন করে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়।


কংগ্রেস প্রথম থেকেই বৃটিশ সরকারকে এ কথা বুঝাতে তৎপর ছিল যে, 'হিন্দুস্থানে একটি জাতিই বসবাস করে এবং কংগ্রেস সমগ্র জাতির প্রতিনিধিত্ব করে।' কিন্তু মুসলিম লীগ কংগ্রেসের এই ভিত্তিহীন দাবীর তীব্র প্রতিবাদ করে বিভিন্ন সময়ে মুসলমানদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তাকে তুলে ধরতে চেষ্টা চালায়। রাজনৈতিক ময়দানে ব্যর্থ হওয়ার পর শিক্ষা কারিকুলামকে কংগ্রেসী হিন্দুরা একক জাতিসত্তার ভিত্তিতে প্রণয়নের চক্রান্ত শুরু করে। বস্তুত সে লক্ষ্যেই ক্ষমতাসীন হওয়ার পর শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়নের জন্যে কংগ্রেস একটি শিক্ষা স্কীম তৈরী করে। সে স্কীমের নাম দেয়া হয় 'ওয়ার্দা স্কীম'। এ স্কীম প্রণীত হয়েছিল গান্ধীর তত্ত্বাবধানে ও গান্ধীর দিকনির্দেশনায়। এ স্কীম ছিল কংগ্রেসের রাজনৈতিক কর্মসূচীর অংশ। কংগ্রেসের পরিকল্পনা ছিল মুসলমানদের তাহযীব তমদ্দুন, সাহিত্য সংস্কৃতি ধর্ম ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান-বিমুখ ভবিষ্যত মুসলিম প্রজন্ম জন্ম দিতে যারা ধর্মকর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হবে এ উদ্দেশ্যে এমন একটি শিক্ষা কারিকুলাম চালু করতে, যাতে মুসলমানদের তাহযীব ও সংস্কৃতিকে বিকৃত করে ফেলা হবে। হিন্দুরা এভাবে শিশু পাঠ্যপুস্তক তৈরীর পরিকল্পনা করেছিল যে, মুসলিম শিশুরা হিন্দু ধর্মের কাছে ইসলাম ধর্ম তুচ্ছ ভাবতে শুরু করবে।


কংগ্রেস সাতটি প্রদেশের শাসন ক্ষমতা অর্জনের ফলে কংগ্রেসী হিন্দুরা মনে করেছিল হিন্দু রাজ প্রতিষ্ঠার সুবর্ণ সুযোগ এসে গেছে। এ সময় হিন্দুরা এমন অনেক রীতি রেওয়াজ চালু করে যেগুলো সরাসরি মুসলমানদের তাহযীব-তমদ্দুন ও ইসলামী সংস্কৃতির পরিপন্থী। এসবের দ্বারা হিন্দুরা ইসলামী চেতনাকে ধ্বংস করতে তৎপর ছিল। এ সময় 'বন্দে মাতরম' এর মতো হিন্দু ধর্মীয় কুফর ও শিরক সম্বলিত ধর্মীয় গীতকে জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দেয়। এসেম্বলী ও ডিস্ট্রিক বোর্ডের প্রত্যেক কাজ "বন্দে মাতরম" সঙ্গীতের মাধ্যমে শুরু করার রীতি চালু করে।হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সকল শিশুদের জন্যে গান্ধীর প্রতিকৃতি সামনে রেখে প্রার্থনা করাকে আবশ্যিক ঘোষণা করে।[২৮]


১৯৩৭-১৯৩৯' সালে, যখন কংগ্রেস স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে সাতটি প্রদেশে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়, তখন কংগ্রেস শাসিত এলাকায় মুসলমানদের গরু জবাইয়ের অধিকার থেকে মাহরুম করার মাধ্যমে অনেক জুলুম-নির্যাতন চালানো হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও জমিয়তপন্থী উলামারা বলেন যে ১৯৪৭' সালে ভারত না ভাগ হলে ভালো হতো। ৪৭' ভারত ভাগ না হলে কংগ্রেসই হতো ভারতের একমাত্র রাজনৈতিক দল এবং কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকলে মুসলমানদের অস্তিত্বের কি সংকট তৈরি হতে,

এসব জুলুমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি। যেমন:


কংগ্রেস শাসনামলে গো-সংরক্ষণের নামে গান্ধী ও কংগ্রেসের নেতাকর্মীরা মুসলমানদের ভীতিপ্রদর্শন করেন এবং তাদের মধ্যে গরু ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ করে দেন। গরু জবাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কসাইদের উপর জুলুম-অত্যাচার করা হতো, তাদের লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়া হতো। গান্ধী গো-সংরক্ষণকারীদের 'গোপাল' উপাধিতে ভূষিত করেন। গান্ধী ও সরদার বল্লভভাই প্যাটেল গো-রক্ষাকে স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে একটি আদর্শিক রূপ দিতে সচেষ্ট ছিলেন। 


ব্রিটিশ শাসনামলেও অনেক এলাকায় গরু কোরবানী প্রচলিত ছিল, কিন্তু কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর, গান্ধী ও কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে মুসলমানদের গরু কোরবানীর অধিকার হরণ করা হয়। মুসলমানরা যখন এর প্রতিবাদ জানায়, তখন কংগ্রেস হাজার হাজার লোক নিয়ে মুসলমানদের উপর হামলা চালায়।


কিছু প্রদেশে মুসলমানরা আইনের আশ্রয় নিলে, আদালত গরু জবাইয়ের বিষয়টিকে বৈধ ঘোষণা করে। কংগ্রেস যখন আইনি ভাবে ব্যর্থ হয়, তখন তারা স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে মুসলমানরা শুধু ঈদের সময় গরু কোরবানী দিতে পারবে। কিন্তু তবুও মুসলমানরা কোরবানী দিলে কংগ্রেসপন্থীরা তাদের উপর অন্যায়-অত্যাচার শুরু করে।


কিছু কিছু প্রদেশে কংগ্রেস গরু কোরবানীকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের উপর অবৈধভাবে 'কর' আরোপ করে।


গরু কোরবানীকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস সরকার কর্তৃক মুসলমানদের উপর দুঃখ-কষ্ট, অসদাচরণ ও অবিচার আরোপের বিষয়টি নিম্নে ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত 'পীরপুর রিপোর্ট'-এ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।


কংগ্রেস শাসন আমলে যে-সকল অধিকার বিশেষভাবে উপেক্ষিত এবং আক্রান্ত হয়েছে তার মধ্যে করা-ঈদে মুসলমানদের গরু কোরবানী এবং তাদের ইচ্ছামত যে-কোন দিন বা উপলক্ষে গরুর মাংস খাওয়ার অধিকর অন্যতম। সরকার এবং তাদের কর্মচারীরা নির্দেশবলে প্রদেশের বিভিন্ন অংশে বহু স্থানে সম্প্রতি মুসলমানদের শুধুমাত্র বকরা-ঈদে নয়, বরং যে-কোন দিনে গরু বা মহিষ হত্যা করতে নিষেধ করে দিয়েছেন। এই অন্যায় ও পীড়নমূলক ব্যবস্থাটি আইন ও শৃঙ্খলার অজুহাতে এবং এরূপ মিথ্যা কারণ দেখিয়ে গ্রহণ করা হয়েছে যে, মুসলমানরা গরু কোরবানীর প্রথাটি প্রমাণ করেনি অথবা তারা প্রকাশ্যে গরু হত্যার প্রস্তাব করেছে অথবা এটা কোন কোন লোকের চোখে অনিষ্টকর প্রভৃতি।[২৯]


গরু জবাইর প্রশ্নটিও ভারতের হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যেকার বিরোধের অন্যতম কারণ হয়ে আসছে সাতটি প্রদেশে। কংগ্রেস কর্তৃক সরকার গঠনের পর গো-সংরক্ষণের প্রশ্নটি বিরাট গুরুত্ব লাভ করেছে এবং এ ব্যাপারে বর্ধিত শক্তিতে প্রচারণা চালান হয়েছে। এরূপ বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে মুসলমানদের গো-হত্যা এবং গো-মাংস খাওয়া পরিহার করার জন্য ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। মুসলমানদের নিকট গরু বিক্রয় বন্ধ করার জন্য সুসংগঠিতভবে বাধা দান করা হয়েছে। যুক্ত প্রদেশের বাল্লিয়া জেলার অন্তর্গত দাদ্রি মেলায় মুসলমান কসাইদের উপর কাপুরুষোচিত আক্রমণ বহু ঘটনার মধ্যে একটি উদাহরণ মাত্র।[৩০]


গো-জবাই বন্ধ করার জন্য কংগ্রেস বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। আমরা সংবাদ পেয়েছি যে, কসাইরা বাজার থেকে পশু নিয়ে ফেরার পথে আক্রান্ত হয়েছে। উদাহারণস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে যে, কিছু সংখ্যক কসাই জেহানাবাদ মহকুমার কালীগ্রাম থেকে পশু নিয়ে আসতেছিল। পাটনা জেলার সদর মহকুমার দুমি গ্রামে হিন্দুরা তাদের আক্রমণ করে এবং তাদের মধ্যে একজন বর্শার আঘাতে গুরুতর জখম হয়, এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।


কোন কোন পৌর শহরের বিশেষ বিশেষ এলাকায়, যেখানে ইতিপূর্বে বিক্রি হত, গরুর মাংস বিক্রয়ের অনুমতি-পত্র বাতিল করে দেয়া হয়েছে। কোন কোন স্থানে কসাইদের তাদের বাণিজ্য চালানোর জন্য অনুমতি-পত্র আদৌ দেয়া হয়নি। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মুজাফফরপুর জেলার একটি মহকুমা হাতিপুরে এ সকল অনুমতি-পত্র পরিশেষে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।[৩১] 


দেশ সাম্প্রদায়িক গোলযোগে বিক্ষুদ্ধ হলেও জনগণ দেশে উত্তেজনা প্রশমনের জন্য হরিপুরা কংগ্রেসের দিকে তাকিয়ে ছিল। দুঃখের বিষয়, গো-প্রদর্শনীর উদ্বোধনী ?

আল ফাতিহা ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্ব 



Comments

Anonymous said…
আলহামদুলিল্লাহ

Popular posts from this blog

হেযবুত তওহীদ’ ॥ মতবাদ, ভ্রান্তি ও অপকৌশল : একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

সকল সংখ্যা বিভাগ লেখকবৃন্দ আপনার জিজ্ঞাসা পরিচিতি যোগাযো বর্ষ: ২১,   সংখ্যা: শাবান ১৪৪৬   |   ফেব্রুয়ারি ২‘হেযবুত তওহীদ’ ॥ মতবাদ, ভ্রান্তি ও অপকৌশল : একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা মাওলানা ফয়জুল্লাহ মুনির প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতির সাথে অতি দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি সংগঠনের নাম ‘হেযবুত তওহীদ’ । বহুরূপী এই সংগঠনটির কার্যক্রম দিন দিন বেড়েই চলেছে। ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতেও ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। যার দরুন অনেক সরলমনা মুসলমান না বুঝেই তাদের দলে যোগ দিয়ে বসছেন। অনেকেই তাদের চটকদার কথায় বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এসব দেখে ও শুনে কোনো কোনো সচেতন ভাই উলামায়ে কেরামের দ্বারস্থ হয়েছেন। জানতে চাইছেন ,  এরা কারা ?  কী তাদের উৎস ?  কেমন তাদের আকীদা-বিশ্বাস ?  আর ইসলামের নামে তারা যেসব কথা বলছে ,  এগুলোর বাস্তবতাই বা কতটুকু ? আমরা একেবারে গোড়া থেকে শুরু করছি। হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠা ও উৎস হেযবুত তওহীদ দলটির প্রতিষ্ঠাতা টাঙ্গাইলের মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী। যিনি ছিলেন কলেজপড়ুয়া একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। আরবী ভাষা সম্পর্কে তার তেমন কোনো জ্ঞান ছিল না। আর কুরআ...

মাছের চামড়ার রহস্য !

মাছের চামড়া আর চিকিৎসাবিজ্ঞান: এক বিস্ময়কর আবিষ্কার! Publisher: Al-Fatiha Foundation Platform: Muslim World আমরা বাঙালি মুসলিমরা মাছ পেলে সেটাকে কেটে, রান্না করে খেয়ে ফেলি—মাছ আমাদের রান্নাঘরের অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় একটি খাবার। কিন্তু কখনো কি আমরা গভীরভাবে চিন্তা করেছি, এই মাছ নামক প্রাণীটিকে আল্লাহ তাআলা কেমন করে সৃষ্টি করেছেন? এর চামড়া, হাড়, পেশি, রক্তনালী—সবকিছু কী নিখুঁতভাবে কাজ করে! আমরা কেবল স্বাদে মগ্ন, অথচ এর ভেতরের গঠন ও কার্যকারিতায় এক অনন্য রহস্য লুকিয়ে আছে। আর এই রহস্য আবিষ্কারে নেমেছে পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীরা। তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন মাছের এমন এক উপকারিতা, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।                       কী সেই আবিষ্কার? সম্প্রতি একদল গবেষক আবিষ্কার করেছেন যে, তেলাপিয়া (Tilapia) মাছের চামড়া মানুষের দেহে পুড়ে যাওয়া ক্ষতস্থানে ব্যবহার করলে তা খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। তারা সেই চামড়াকে এক ধরনের 'জীবন্ত ব্যান্ডেজ' হিসেবে ব্যবহার করছেন। এই মাছের চামড়া মানবচামড়ার মতোই কোলাজেন সমৃদ্ধ, নমনীয়, এবং...

হারিয়ে যাওয়া মুসলিম সভ্যতা | পর্ব ১

  হারিয়ে যাওয়া মুসলিম সভ্যতা পর্ব ১: আন্দালুস—যেখানে চাঁদ নামত মুসলিম মসজিদের গম্বুজে ✍️ লেখক: গাজী আমিনুল ইসলাম আল কাসেমী একটি সভ্যতা ছিল, যার সূর্য ডুবত না। যার ঘরে ঘরে ছিল জ্ঞানচর্চার আলয়। যার শহরে ছিল সুশৃঙ্খল রাস্তা, শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাজার হাজার পাণ্ডিত্যের উৎস। যেখানে মসজিদ ছিল লাইব্রেরি, হাসপাতাল ছিল ওয়াক্‌ফের অংশ, ও রাস্তায় রাত্রি জাগত বাতির আলো। সেই শহর, সেই ভূমি— আন্দালুস । 🌙 ইউরোপের বুকে এক মুসলিম জগত আজকের স্পেনের দক্ষিণাঞ্চল এক সময় ছিল মুসলিমদের শাসিত এক গৌরবময় ভূমি। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে তরিক ইবনে জিয়াদের অগ্নিশপথ দিয়ে যাত্রা শুরু, আর শুরু হলো এক বিস্ময়কর ইতিহাস—যা টিকেছিল প্রায় আট শতাব্দী। কর্ডোভা, গ্রানাডা, তোলে‌দো, সেভিল, আলমেরিয়া— এই শহরগুলো শুধু নাম নয়, একেকটা ছিল সভ্যতার একেকটি স্তম্ভ। ইউরোপ যখন ডুবে ছিল গোঁড়ামি, কুসংস্কার আর গির্জার আধিপত্যে, তখন আন্দালুস ছিল— গণশিক্ষার কেন্দ্র মহাকাশবিদ্যা, চিকিৎসা, গণিত ও দর্শনের স্বর্ণযুগ ইসলামী আধ্যাত্মিকতা ও শিল্পের চূড়ান্ত রূপ 🕌 কর্ডোভার সেই মহান রাত্রি ইতিহাসবিদরা লিখেছেন, কর্ডো...