-আর্যসমাজ—নাম শুনলেই মনে পড়ে এমন এক ধুরন্ধর অপপ্রচারকারী হিন্দুধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে, যাদের অপপ্রচারের জবাবে বিতর্ক করতে চাইলে টালবাহানা করে নানা শর্তারোপ করে এবং তর্কে এঁটে উঠতে না পারলে গালিগালাজ করে উধাও হয়ে যায়। এটা আর্যসমাজীদের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধুমাত্র বর্তমান যুগের আর্যসমাজীরা যে এমন ধুরন্ধর তা কিন্তু নয়; আর্যসমাজের প্রতিষ্ঠা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীও বড় মাপের ধুরন্ধর ছিল। আজ তার লেজ গুটিয়ে পালানোর কাহিনী সম্পর্কে একটু আলোকপাত করব।
-ব্রিটিশ-ভারত। গোলামীর শিকলে ভারতবর্ষ আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। ভারতবর্ষের এমন দুর্দিনে আবির্ভাব ঘটে এক নয়া হিন্দুত্ববাদী শক্তির। আর্যসমাজ—স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী যার প্রতিষ্ঠাতা। ভারতবর্ষে বেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই যার অন্যতম লক্ষ্য। এই লক্ষ্যের প্রধান প্রতিবন্ধক মুসলিম জনগোষ্ঠী। সুতরাং, স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী তার পূর্ণ শক্তি নিয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুসলিমের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর কোনো সুযোগই সে হাতছাড়া করত না। লেখালেখি, বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে সে ইসলামবিদ্বেষ ছড়িয়ে যেতে থাকে।
-১৮৭৮ ঈসাব্দের ২৯ জুলাই। স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী তখন উত্তরাখণ্ড রাজ্যের রুড়কি শহরে পৌঁছে বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে ইসলামবিদ্বেষ ছড়াতে ব্যস্ত। স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর জীবনীকারদের মতে, রুড়কি শহরে অবস্থানকালে ৪র্থ দিনের ভাষণে তিনি বলেছিলেন—ইসলামের ওপর সবচেয়ে কঠিনতম অভিযোগগুলো তিনি উপস্থাপন করে যাচ্ছেন। স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর এমন উগ্রতার ফলে অতিষ্ঠ হয়ে সেখানকার মুসলিমরা হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা মুহাম্মাদ কাসেম নানুতবি (রহ.)-কে রুড়কি শহরে এসে তার সাথে বিতর্কে বসার জন্য প্রচুর পীড়াপীড়ি করতে থাকে।
-হযরতজী তখন প্রচণ্ড অসুস্থ। তবুও তিনি ইসলামের খাতিরে রুড়কি শহরে গিয়ে উপস্থিত হন। আশপাশের মুসলিমরা হযরতজীর আগমনের সংবাদ পেয়ে তার বক্তৃতা শোনার জন্য উপস্থিত হয়। হযরতজীর পক্ষ থেকে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীকে বিতর্কে বসার জন্য আহ্বান জানানো হয়; কিন্তু তিনি বিতর্কে বসতে রাজি হচ্ছিলেন না। তিনি টালবাহানা শুরু করে নানারকম শর্তারোপ করে যাচ্ছিলেন। তার এমন আচরণ দেখে জ্ঞানীসমাজ স্পষ্টই বুঝতে পারছিল তার উদ্দেশ্য ঠিক কী! একপর্যায়ে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী রুড়কি শহর ত্যাগ করে। অগত্যা হযরতজী সেখানে একটি জনসমাবেশে ওয়াজ করেন, এবং সেই ওয়াজের মাধ্যমে তিনি স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর অপপ্রচারের জবাব প্রদান করেন।
-এরপর হযরতজী দারুল উলুম দেওবন্দে ফিরে আসেন এবং স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর অপপ্রচারের জবাবে যে বক্তৃতা প্রদান করেছিলেন সেগুলো বই আকারে সংকলন করেন। স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর মূল অভিযোগ ছিল, পবিত্র কাবার দিকে কিবলামুখী হয়ে সালাত আদায় করা নাকি মূর্তিপূজা! এজন্য তিনি তার লেখা বইয়ের নাম দেন "কিবলানামা"। বইটির কলেবর বেশ বড় ছিল।
-স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী এতটুকুতেই ক্ষান্ত হননি। তিনি নানাদিক ঘুরতে ঘুরতে উত্তরপ্রদেশের মিরাট শহরে এসে উপস্থিত হন এবং এখানেও একই অপপ্রচার শুরু করেন। আসলে যার লজ্জা নেই, সে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। ঘটনাচক্রে হযরতজীও মিরাট শহরের কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন। মিরাট শহরের জনগণ তাকে মিরাট শহরে এসে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর সাথে বিতর্কে বসার জন্য অনুরোধ করতে থাকে। হযরতজী তখনও অনেক অসুস্থ। শরীরের শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তবুও তার সাহস ছিল অপরিসীম। এখানেও স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীকে বিতর্কে বসার জন্য আহ্বান জানানো হয়; কিন্তু তার বাহানার অন্ত ছিল না। একসময় সে এখান থেকেও উধাও হয়ে যায়। এখানেও হযরতজী একটি জনসমাবেশে তার অপপ্রচারের জবাব প্রদান করেন। এরপর এ নিয়ে রচনাও সংকলন করেন, যেগুলো হযরতজীর শিষ্য মাওলানা আবদুল আলি মিরাঠি (রহ.) জবাবের আঙ্গিকে সংকলন করেন। তিনি সেই বইয়ের নাম দেন "তুর্কি ব-তুর্কি"। স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর কতিপয় আস্থাভাজন তার বইয়ের জবাবে কিছু লেখা প্রকাশ করে, যা ছিল আপাদমস্তক জালিয়াতি। স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী ইসলামের প্রতি যে অপপ্রচার করেছিলেন এই বই ছিল তার দাঁতভাঙা জবাব।
-এই হলো পালানোর ইতিহাস; সূচনালগ্ন থেকে যা আজও চলমান।
-তথ্যসূত্র:
-হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা মুহাম্মাদ কাসেম নানুতবি রহ.: জীবন ও কর্ম, লেখক: হজরত মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াকুব নানুতবি রহ.।

Comments