সালাহুদ্দীন আইয়ুবী রাহ.-এর আলকুদস জয়
১৫ রজব ৫৮৩ হিজরীতে সালাহুদ্দীন আইয়ুবী আলকুদস অবরোধ করেন। তিনি শান্তিপূর্ণভাবে শহর হস্তান্তরের প্রস্তাব দেন। কিন্তু শহরের পাদ্রী প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সালাহুদ্দীন আইয়ুবী টানা ১২ দিন মিনজানিক দিয়ে অব্যাহত আক্রমণ করে যান। হামলার ভয়াবহতা দেখে ক্রুসেডাররা শান্তি প্রস্তাব করে। সালাহুদ্দীন আইয়ুবী প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তোমরা দীর্ঘ ৯২ বছর মুসলমানদের সাথে যে আচরণ করেছ, আমি তোমাদের সাথে সে আচরণই করব।
ক্রুসেডাররা জবাবে বলে, আমরা আমাদের সন্তান, নারী ও পশুদের হত্যা করব। তারপর বাইতুল মাকদিস জ্বালিয়ে দেব। আমাদের হাতে বন্দি ৫ হাজার মুসলমানকেও জবাই করব। তারপর মরণপণ লড়াই করব।
এ জবাব শুনে সালাহুদ্দীন আইয়ুবী দ্বিধায় পড়ে যান। পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত হয়, বাইতুল মাকদিস হস্তান্তরের পর জিযিয়ার বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। ২৭ হিজরী রজব মাসে আলকুদস শহর মুসলমানদের হাতে আসে। ক্রুসেডাররা মসজিদে আকসাকে এতটাই অপরিচ্ছন্ন করেছিল যে, তা পরিষ্কার করতে এক সপ্তাহ লেগে যায়। সালাহুদ্দীন আইয়ুবী এ বছর ঈদুল আযহা আল-কুদসে উদ্যাপন করেন।
৫৮৫ হিজরীর রজব মাসের মাঝামাঝিতে ক্রুসেডাররা গাই ডি লুসিগনানের নেতৃত্বে সুরের নিকটবর্তী শহর আক্কা অভিমুখে রওয়ানা করে। লুসিগনানকে ফ্রান্সে চলে যাওয়ার শর্তে সালাহুদ্দীন আইয়ুবী আট মাস বন্দি রাখার পর মুক্তি দিয়েছিলেন। কিন্তু সে ওয়াদা ভঙ্গ করে এবং সুরে গিয়ে পরাজিত ক্রুসেডারদের সঙ্গে মিলিত হয়। ওয়াদা ভঙ্গের দরুন সালাহুদ্দীন আইয়ুবী খুবই ক্ষিপ্ত হন। তিনি আক্কায় পৌঁছার আগেই ক্রুসেডাররা আক্কায় পৌঁছে যায় এবং শহর অবরোধ করে। ক্রুসেডারদের কৌশলগত অবস্থান ও বিপুল শক্তিমত্তার দরুন সালাহুদ্দীন আইয়ুবী ব্যর্থ হন। পূর্ণ দুই বছর অবরুদ্ধ থাকার পর মুসলমানরা ক্রুসেডারদের সঙ্গে সন্ধি করতে বাধ্য হয়।
এর মধ্যে বাইতুল মাকদিসে ক্রুসেডারদের সহযোগিতা করার জন্য ইউরোপে বৃহত্তর ঐক্য সৃষ্টি হয়। এটা ছিল তৃতীয় বৃহত্তম ঐক্য। প্রথম ঐক্য ছিল প্রথম ক্রুসেড অভিযানের সময়। যা খুবই সফল হয়েছিল। তাদের মাঝে দ্বিতীয় বৃহত্তম ঐক্য হয়েছিল রুহা রাজ্যের পতনের পর। ক্রুসেডের এ অভিযান নুরুদ্দীন যেনকী ব্যর্থ করে দেন। এর কোনো ফলাফল ছিল না। আক্কা শহর ক্রুসেডারদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার পর ইয়াফা, আসকালান, কায়সারিয়া, আরসোফ, হাইফা ক্রুসেডারদের হাতে চলে যায়। ২৭ সফর ৫৮৯ হিজরীতে মহাবীর সালাহুদ্দীন আইয়ুবী ইন্তেকাল করেন।
তাঁর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে মুসলমানরা চরম সংকটে নিপতিত হয়। ক্ষমতা নিয়ে চরম দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। মুসলমানদের বিবাদ-বিসংবাদের নয় বছর পর সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর ভাই আদিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। এর মধ্যে ক্রুসেডারদের হাতে বৈরুতের পতন ঘটে। মুসলিম বিশ্বের ঐক্য দেখে ইউরোপীয়রা বিপদ আঁচ করতে পারে। ৫৯৯ হিজরী/১২০২ ঈসাব্দে চতুর্থ ক্রুসেড শুরু হয়। কিন্তু এ ক্রুসেড লক্ষভ্রষ্ট হয়। ক্রুসেডাররা আলকুদসের পরিবর্তে বাইজান্টাইনদের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের দিকে ধাবিত হয়। তারা বাইজান্টাইন সম্রাটকে হত্যা করে কনস্টান্টিনোপল দখল করে নেয়। তারা স্বজাতির ওপর হত্যা ও লুটতরাজ চালায়। রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়।
আদিল ৫৯৮-৬১৫ হিজরী পর্যন্ত মুসলিমবিশ্ব শাসন করেন। তিনি এ দীর্ঘ সময়ে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত অভিযান পরিচালনা করেননি। অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তৎপর হন। ফলে ৬১৫ হিজরীতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় পঞ্চম ক্রুসেড। অভিযানের কথা শুনে আদিল মিশর ছেড়ে ফিলিস্তিন রক্ষার্থে ছুটে আসেন। ক্রুসেডারদের বিপুল সংখ্যার কথা শুনে তিনি সৈন্য সংগ্রহের জন্য দামেশকে যান। আদিলের মিশর ত্যাগের কথা জেনে ক্রুসেডাররা মিশরের প্রধান বন্দর দিময়াতে অবতরণ করে। এসময় দামেশকে আদিলের ইন্তেকাল হয়। মিশরজুড়ে ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টি হয়। মানসূরার সীমান্তে ইসলামী শক্তি ও ক্রুসেডারদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি বেসামাল দেখে কামিল ক্রুসেডারদের কাছে খুব অপমানকর এক প্রস্তাব পেশ করেন, ক্রুসেডাররা দিময়াত ছেড়ে চলে গেলে আলকুদসসহ সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর বিজিত সব অঞ্চল তাদেরকে দিয়ে দেবন। তবে কামিলের একটি শর্ত ছিল, কার্ক ও শোবাক অঞ্চল এর বাইরে থাকবে। এজন্য পোপের প্রতিনিধি এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের দরুন উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়।
এমন অপমানকর প্রস্তাবের পরও আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে বিজয় দান করেন। পরাজয়ের মুখে ক্রুসেডাররা জান নিয়ে কোনোরকম বাড়ি যাওয়ার আকুতি জানায়। এভাবেই আল্লাহ সে সময় ফিলিস্তিনকে হেফাজত করেন।
৬২৪ হিজরীতে জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার দ্বিতীয় সম্রাট ফেডারিকের নেতৃত্বে ষষ্ঠ ক্রুসেড পরিচালিত হয়। মাত্র ৫০০ যোদ্ধা নিয়ে সে অভিযানে বের হয় তারা। দুর্বলচিত্তের শাসক দ্বিতীয় কামিল তাকে প্রস্তাব দেয়, যদি যুদ্ধ না করে সে ফিরে যায় তাহলে তাকে আলকুদস দিয়ে দেওয়া হবে। কামিল সত্যি সত্যিই ক্রুসেডারদের হাতে আলকুদস সোপর্দ করে। মাত্র ৫০০ সৈন্য নিয়ে ৬২৫হিজরী/১২৩৮ ঈসাব্দে ফেডারিক আলকুদস বুঝে নেয়। তবে কামিল একটা শর্ত জুড়ে দিয়েছিল আলকুব্বাতুসা সাখরা ও আলআকসা মসজিদ তাদেরকে দেওয়া হবে না। কামিল ৬১৫-৬৩৫ হিজরী পর্যন্ত ২০ বছর শাসন করেন। সালহুদ্দীন আইয়ুবীর কুদস বিজয়ের ৪৩ বছর পর এই পতনের ঘটনা ঘটে। ৬৩৭ হিজরী/১২৩৯ ঈসাব্দে নাজমুদ্দীন আইয়ুব শাসনভার গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন নেককার শাসক। তিনি সবকিছু নতুন করে ঢেলে সাজান। এসময় নাজমুদ্দীনের ভাতিজা ইসমাঈল দামেশকের ক্ষমতায় বসেন। সে ক্ষমতার জন্য হেন কোনো কাজ নেই করেনি। মিশর দখল করতে সে ক্রুসেডারদের সাথে হাত মেলায়।
৬৩৭ হিজরীতে নাসির দাউদ নিজস্ব বাহিনী নিয়ে আলকুদসে অভিযান চালান। তার এ অভিযান ইসলামের টানে ছিল না। সে শুধু নিজের সাম্রাজ্য গড়তে চেয়েছিল। সে ক্রুসেডারদের হাত থেকে আলকুদস ছিনিয়ে আনে। দ্বিতীয় কামিলের আলকুদস দিয়ে দেওয়ার ১১ বছর পর আবার ক্রুসেড শাসনের অবসান ঘটে। দাউদ আলকুদস দখল করতেই ইসমাঈল এসে হাজির হয়। সে আলকুদস তার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ক্রুসেডারদের হাতে তুলে দিতে চায়। বিনিময়ে সে পাবে মিশর দখলে ক্রুসেডারদের সহায়তা। এমনকি সে মসজিদে আকসা ও কুব্বাতুস সাখরাও দিয়ে দিতে রাজি হয়। ৬৩৮ হিজরী/১২৪০ ঈসাব্দে দ্বিতীয় বারের মতো আলকুদস ক্রুসেডারদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
সুলতান নাজমুদ্দীন আইয়ুব ৬৪২ হিজরী/১২৪৪ ঈসাব্দে আলকুদস পুনরুদ্ধার করেন। এরপর থেকে ৬৯৩ বছর প্রায় সাত শতাব্দী ধরে আলকুদসে ইসলামী শাসন চালু থাকে। ১৩৩৫ হিজরী/১৯১৭ ঈসাব্দে ব্রিটিশ-বাহিনীর আলকুদসে প্রবেশের মধ্য দিয়ে সেই ধারার অবসান ঘটে।
নাজমুদ্দীন আইয়ুবের কুদস জয়ের কথা শুনে ফরাসি সম্রাট নবম লুইসের নেতৃত্বে ক্যথলিক পোপ সপ্তম ক্রুসেডের ডাক দেন। ২ মুহাররম ৬৮৪ হিজরী/ ১২৫০ ঈসাব্দে ফারিস্কুর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ক্রুসেডাররা চরমভাবে পরাজিত হয়। বন্দি হয় নবম লুইস। ক্রুসেডারদের প্রায় ৩০ হাজার সৈন্য নিহত হয়।
নাজমুদ্দীন আইয়ুবের মৃত্যুর পর নানান ঘটনা-দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে মিশরের ক্ষমতায় আসে মামুলুকেরা। মামলুকদের শ্রেষ্ঠ শাসক সাইফুদ্দীন কুতুয মুসলিম বিশ্বের জন্য তাতারীদের বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়ান। ৬৫৪ হিজরী/১২৬০ ঈসাব্দে গাজায় মোতায়েন করা তাতার বাহিনীকে পরাজিত করেন। এরপর তিনি তাতারদের আইনুল জালুতের যুদ্ধে টেনে আনেন। ২৫ রমযান ৬৫৮ হিজরীতে আইনুল জালুতের প্রান্তরে মুসলমানরা ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করে।
সাইফুদ্দীন কুতুযের পর ক্ষমতা লাভ করেন যহীরুদ্দীন বাইবার্স। চার বছরে শাসন-ক্ষমতা গোছানোর পর ৬৬৩ হিজরীতে ক্রুসেডারদের দিকে মনোযোগ দেন। একসাথে তিনি একাধিক ক্রুসেড সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
এরপর ক্ষমতায় আসেন সাইফুদ্দীন কালাউন। তিনিও ক্রুসেডারদের ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। ৬৮৮ হিজরীতে তিনি ক্রুসেড রাজ্য তারাবলুস জয় করেন। ৬৮৯ হিজরীতে তাঁর ওফাত হয়। শাসন-ক্ষমতায় আসেন তাঁর পুত্র আশরাফ খলীল। তিনি মুসলিম বিশ্বে গড়ে ওঠা অবশিষ্ট ক্রুসেডারদেরও উচ্ছেদ করেন। মুসলমান শাসনাধীনে ইহুদীরা সুখে-শান্তিতে বসবাস করছিল। যে সময়টাতে ৬৯০ হিজরী/১২৯০ ঈসাব্দে ইংল্যান্ডের রাজা এডওয়ার্ড ইহুদীদের দেশ ত্যাগ করতে নির্দেশ দেন। এর এক বছর পর ফ্রান্সের সম্রাট প্রথম ফিলিপ ইহুদীদের ফ্রান্স ছাড়তে বিল পাশ করেন। তবে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলে ছিল ভিন্ন কথা। তখন দলে দলে ইহুদীরা খ্রিস্টধর্ম গহণ করতে থাকে। তাদের এ ধর্মগ্রহণ ছিল কেবলই নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য। এদের মাধ্যমেই জন্ম নেয় খ্রিস্টিয় জায়নবাদের।
মামলুক সাম্রাজ্যের শেষের দিকে উসমানী সাম্রাজ্যের উত্থান হতে থাকে। উসমান ইবনে আরতুগ্রুলের হাত ধরে এ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা লাভ করে। শক্তিমত্তা ও দুর্বলতা মিলিয়ে ৬৪৩ বছর এই সাম্রাজ্য স্থায়ী হয়। ৯২২ হিজরী/১৫১৬ ঈসাব্দে মার্জ দাবিক ময়দানে উসমানী ও মামলুক বাহিনীর মাঝে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে উসমানী সুলতান প্রথম সেলিম বিজয়ী হন। মামলুক বাহিনী পর্যদুস্ত হয়। এ বিজয়ের পর সুলতান সেলিম একে একে সিরিয়া, ফিলিস্তিন, লেবানন জয় করে নেন। এরপর মামলুকদের শেষ আশ্রয় মিশরও দখল করেন। আমি পড়ে তথ্য সমৃদ্ধ দেখি এরপর আপনাদের সুবিধার্থে দিয়েছি।সুত্র: আল কাউসার ১৬.১১.২০২৩

Comments