Skip to main content

বাদশাহ আওরঙ্গজেব আলামগীর


 ''বাদশাহ আওরঙ্গজেব আলামগীর" 


সম্রাট মুহিউদ্দিন মুহাম্মাদ আওরঙ্গজেব আলামগীর বাদশাহ্ গাজী। তিনি ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের ষষ্ঠ সম্রাট এবং ভারতের সবচাইতে শক্তিশালী সম্রাটদের একজন। তিনি ভারতের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মুসলিম শাসক। তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বাধিক বিস্তৃতি ঘটান এবং তাঁর সময়ে মুঘল সাম্রাজ্য প্রায় সমগ্র ভারত ব্যাপী বিস্তৃত হয়। তিনি ডেকান শিয়া সালতানাতসমূহের চূড়ান্ত পতন ঘটান এবং তাঁর সময়ে মুঘল সাম্রাজ্যের আয়তন দাঁড়ায় ৪০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার বা, ৪ মিলিয়ন। তিনি তাঁর সাম্রাজ্যে পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহ আইনের প্রবর্তন করেন এবং গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি বাদশাহ আকবর কর্তৃক রহিতকৃত অমুসলিমদের উপর জিজিয়া কর পুনরায় চালু করেন। তিনি ''ফতোয়া-ই আলামগীরী" নামে সাম্রাজ্যের আইন সংস্কার করেন । আওরঙ্গজেব মদ্যপানের উপর  নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। তিনি বিদ্রোহাত্মক হুমকিদায়ক কার্যকলাপ ও বিশৃঙ্খলার অবতারণাকারী শিখ গুরু তেগ বাহাদুর কে মৃত্যুদণ্ড দেন।

আওরঙ্গজেব (রহ.) ছিলেন যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান। তাঁর পিতা সম্রাট শাহাব উদ্দিন মুহাম্মাদ শাহ জাহান উরফে মুহাম্মাদ খুররাম শাহ্ ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের পঞ্চম শাসক এবং আওরঙ্গজেবের মা মুমতাজ মেহেল ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের উজিরে আজম আসফ খানের কন্যা , সম্রাজ্ঞী  নূরজাহানের ভাইঝি এবং মুঘল সাম্রাজ্যের শীর্ষ কর্মকর্তা  ইতিমাদ-উদ-দৌলা মির্জা গিয়াস বেগের নাতনী। আওরঙ্গজেব শাহ জাহান ও মুমতাজ মেহেলের তৃতীয় পুত্র।


 ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত দক্ষ বীর যোদ্ধা ছিলেন আওরঙ্গজেব। তিনি ছিলেন কুরআনের হাফেজ এবং পরহেজগার ধর্মপ্রাণ মুসলমান। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি বিধান অনুসরণ করতেন এই জনদরদী মহান সম্রাট। সমরাঙ্গনে,  রাষ্ট্রপরিচালনায় ও প্রশাসনিক অঙ্গনে দক্ষতার কারণে  সেনাপতি ও মন্ত্রীদের কাছে শাহ জাহানের ওয়ারিশ হিসেবে সবচাইতে যোগ্য ছিলেন শাহজাদা আওরঙ্গজেব। কিন্তু পিতা শাহ জাহানের নিকট সবচেয়ে প্রিয় ওয়ারিশ ছিলেন প্রথম পুত্র শাহজাদা দারাশিকোহ।  দারাশিকোহ  ছোটোবেলা থেকে পিতার আদরে আদরে বড় হওয়ায় রাষ্ট্রপরিচালনায় ও সমরক্ষেত্রে অযোগ্য, অকর্মণ্য ছিলেন এবং অনেকক্ষেত্রে অধার্মিক ছিলেন -- পূর্বসুরী বাদশাহ  আকবরের সাথে তাঁর মিল চোখে পড়ে। 


অধার্মিক চিন্তাধারার কারণে  হিন্দু প্রজাদের কাছে  শাহজাদা  দারাশিকোহর গ্রহণযোগ্যতা স্বাভাবিকভাবেই  ছিলো বেশি  যেমনটা ছিলো বাদশাহ আকবারের। বারানসীর পণ্ডিতদের কাছে বেদ-বেদান্ত-রামায়ণ ইত্যাদি আর্য  ধর্মগ্রন্থ পাঠ শিখেছিলেন ও এসবের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিলো যথেষ্ট।

ফলে, দারাশিকো সিংহাসনে বসলে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে অসন্তোষ এবং অনেকক্ষেত্রে মুসলমান সামরিক কর্মকর্তাদের দ্বারা বিদ্রোহের ঘটনাও ঘটতে পারতো,, যেমনটা আকবরের রাজত্বকালে শাইখ মুজাদ্দিদে আলফেসানী (রহ.) করেছিলেন এবং যেভাবে ভাটিরাজ ঈসা খাঁ মাসনাদ- ই আলার নেতৃত্বে ১৫৮২ সালে দ্বীন- ই ইলাহি ঘোষণার পর বাংলায় সকল বিদ্রোহী সেনানায়ক একজোট হয়ে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন। 


তাই দারাশিকোকে পরাজিত করে আওরঙ্গজেবের সিংহাসনারোহণ ছিলো ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৬৫৭ সালে শাহ জাহান অসুস্থ হয়ে পড়লে শাহ জাহানের মৃত্যু হয়েছে এই গুজব ছড়িয়ে পড়ে ও দারাশিকোহ ক্ষমতা দখলের জন্য তা গোপন করেছেন বলে ছড়িয়ে পড়ে। আওরঙ্গজেব ও মুরাদ একজোট হয়ে দারাশিকোহর বিরুদ্ধে বাহিনী সহ দিল্লীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন এবং দারাশিকোহকে পরাজিত করে সিংহাসন দখল করেন।   জনৈক সেনাকর্মকর্তাকে হত্যার অভিযোগে  শাহ জাদা মুরাদ কে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো । এরপর, দারাশিকোহকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে ইসলাম ত্যাগ করে মুর্তাদ হবার  অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। 

সম্রাট শাহ জাহান কে প্রয়োজনীয় সকল সুযোগ-সুবিধা, খাদেম,চিকিৎসক,  নিরাপত্তা সহ নজরবন্দি করে রাখা হয়। 


 বাংলা শাসনকারী তাঁর ভাই  শাহ সুজাকে তিনি  তাঁর  আনুগত্য মেনে নিয়ে সুবাদার হিসেবে বহাল থাকার পরামর্শ দেন। কিন্তু, শাহ সুজা তা না মেনে নিজেকে বাংলার স্বাধীন সুলতান ঘোষণা  করলেন। ১৬৫৯ সালে আওরঙ্গজেবের  বাহিনী শাহজাদা শাহ সুজা কে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। বাংলার একসময়ের পরাক্রমশালী সুবাদার শাহ সুজা আশ্রয় নিলেন আরাকানরাজ্যের চট্টগ্রামে। 


১৫৭৬ সালে বাংলার শেষ সম্রাট দাউদ শাহর পতনের পর মুঘলদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আরাকানিরা চট্টগ্রাম দখল করে নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলে জলদস্যুতার মাধ্যমে প্রায় ১০০ বছর চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রাখে- 

আরাকানে রাজনৈতিক আশ্রয়রত অবস্থায় নিহত হলেন শাহজাদা সুজা। তৈমূরী খান্দানের এই অপমানে আরাকানিদের প্রতি ক্রুব্ধ হলেন বাদশাহ আওরঙ্গজেব। 

 


পিতা শাহ জাহানের রাজত্বকালে মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থনীতি উন্নয়নের শিখরে আরোহণ করে।  করদ  রাজ্য  গোলকুন্ডা ও বিজাপুর সালতানাত থেকে  প্রাপ্ত কর  এবং মধ্য এশিয়ার জানী খানাত থেকে প্রাপ্ত করে মুঘলরা দিন দিন ধনী হতে থাকে, যা চূড়ান্ত পরিণতি পায় আওরঙ্গজেবের রাজত্বে। 


তাঁর সময়ে মারাঠারা দক্ষিণ ভারতের পার্বত্য অঞ্চলে বিদ্রোহাত্মক কর্মকাণ্ড শুরু করে।  বিজাপুর সালতানাতের সাবেক সেনাপতি শাহজি ভোসলের পুত্র শিবাজি স্থানীয় মারাঠা যুবক ও মাওয়ালী নামক পাহাড়ী ডাকাতদলের সাহায্যে ছোটোখাটো বাহিনী গঠন করে পার্বত্য এলাকার মুঘল কেল্লা জয় করতে থাকেন। শিবাজী ১৬৭৪ সালে সুরাটে নিজেকে স্বাধীন রাজা (ছত্রপতি) ঘোষণা করেন। আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মির্জা রাজা জয়সিংহ শিবাজীকে পরাজিত করেন এবং শিবাজি মুঘল ভাসালে পরিণত হয়। ১৬৮০ সালে শিবাজি মারা গেলে শিবাজীর পুত্র সম্ভাজি পুনরায় বিদ্রোহ করে এবং ১৬৮৯ সালের যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হয় এবং তার পুরো পরিবার বন্দি হয়।


 আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালের শেষে চীনকে ছাড়িয়ে ভারত পৃথিবীর সবচাইতে ধনী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালের শেষে মৃত্যুর সময় তাঁর কোনো ইচ্ছাই অপূর্ণ ছিলো না। 


তথ্যসূত্র- ১. চেপে রাখা ইতিহাস- গোলাম আহমাদ মর্তুজা

২. The Era of Bajirao- Uday S Kulkarni

৩. উইকিপিডিয়া







Comments

Popular posts from this blog

হেযবুত তওহীদ’ ॥ মতবাদ, ভ্রান্তি ও অপকৌশল : একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

সকল সংখ্যা বিভাগ লেখকবৃন্দ আপনার জিজ্ঞাসা পরিচিতি যোগাযো বর্ষ: ২১,   সংখ্যা: শাবান ১৪৪৬   |   ফেব্রুয়ারি ২‘হেযবুত তওহীদ’ ॥ মতবাদ, ভ্রান্তি ও অপকৌশল : একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা মাওলানা ফয়জুল্লাহ মুনির প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতির সাথে অতি দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি সংগঠনের নাম ‘হেযবুত তওহীদ’ । বহুরূপী এই সংগঠনটির কার্যক্রম দিন দিন বেড়েই চলেছে। ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতেও ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। যার দরুন অনেক সরলমনা মুসলমান না বুঝেই তাদের দলে যোগ দিয়ে বসছেন। অনেকেই তাদের চটকদার কথায় বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এসব দেখে ও শুনে কোনো কোনো সচেতন ভাই উলামায়ে কেরামের দ্বারস্থ হয়েছেন। জানতে চাইছেন ,  এরা কারা ?  কী তাদের উৎস ?  কেমন তাদের আকীদা-বিশ্বাস ?  আর ইসলামের নামে তারা যেসব কথা বলছে ,  এগুলোর বাস্তবতাই বা কতটুকু ? আমরা একেবারে গোড়া থেকে শুরু করছি। হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠা ও উৎস হেযবুত তওহীদ দলটির প্রতিষ্ঠাতা টাঙ্গাইলের মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী। যিনি ছিলেন কলেজপড়ুয়া একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। আরবী ভাষা সম্পর্কে তার তেমন কোনো জ্ঞান ছিল না। আর কুরআ...

মাছের চামড়ার রহস্য !

মাছের চামড়া আর চিকিৎসাবিজ্ঞান: এক বিস্ময়কর আবিষ্কার! Publisher: Al-Fatiha Foundation Platform: Muslim World আমরা বাঙালি মুসলিমরা মাছ পেলে সেটাকে কেটে, রান্না করে খেয়ে ফেলি—মাছ আমাদের রান্নাঘরের অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় একটি খাবার। কিন্তু কখনো কি আমরা গভীরভাবে চিন্তা করেছি, এই মাছ নামক প্রাণীটিকে আল্লাহ তাআলা কেমন করে সৃষ্টি করেছেন? এর চামড়া, হাড়, পেশি, রক্তনালী—সবকিছু কী নিখুঁতভাবে কাজ করে! আমরা কেবল স্বাদে মগ্ন, অথচ এর ভেতরের গঠন ও কার্যকারিতায় এক অনন্য রহস্য লুকিয়ে আছে। আর এই রহস্য আবিষ্কারে নেমেছে পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীরা। তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন মাছের এমন এক উপকারিতা, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।                       কী সেই আবিষ্কার? সম্প্রতি একদল গবেষক আবিষ্কার করেছেন যে, তেলাপিয়া (Tilapia) মাছের চামড়া মানুষের দেহে পুড়ে যাওয়া ক্ষতস্থানে ব্যবহার করলে তা খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। তারা সেই চামড়াকে এক ধরনের 'জীবন্ত ব্যান্ডেজ' হিসেবে ব্যবহার করছেন। এই মাছের চামড়া মানবচামড়ার মতোই কোলাজেন সমৃদ্ধ, নমনীয়, এবং...

হারিয়ে যাওয়া মুসলিম সভ্যতা | পর্ব ১

  হারিয়ে যাওয়া মুসলিম সভ্যতা পর্ব ১: আন্দালুস—যেখানে চাঁদ নামত মুসলিম মসজিদের গম্বুজে ✍️ লেখক: গাজী আমিনুল ইসলাম আল কাসেমী একটি সভ্যতা ছিল, যার সূর্য ডুবত না। যার ঘরে ঘরে ছিল জ্ঞানচর্চার আলয়। যার শহরে ছিল সুশৃঙ্খল রাস্তা, শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাজার হাজার পাণ্ডিত্যের উৎস। যেখানে মসজিদ ছিল লাইব্রেরি, হাসপাতাল ছিল ওয়াক্‌ফের অংশ, ও রাস্তায় রাত্রি জাগত বাতির আলো। সেই শহর, সেই ভূমি— আন্দালুস । 🌙 ইউরোপের বুকে এক মুসলিম জগত আজকের স্পেনের দক্ষিণাঞ্চল এক সময় ছিল মুসলিমদের শাসিত এক গৌরবময় ভূমি। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে তরিক ইবনে জিয়াদের অগ্নিশপথ দিয়ে যাত্রা শুরু, আর শুরু হলো এক বিস্ময়কর ইতিহাস—যা টিকেছিল প্রায় আট শতাব্দী। কর্ডোভা, গ্রানাডা, তোলে‌দো, সেভিল, আলমেরিয়া— এই শহরগুলো শুধু নাম নয়, একেকটা ছিল সভ্যতার একেকটি স্তম্ভ। ইউরোপ যখন ডুবে ছিল গোঁড়ামি, কুসংস্কার আর গির্জার আধিপত্যে, তখন আন্দালুস ছিল— গণশিক্ষার কেন্দ্র মহাকাশবিদ্যা, চিকিৎসা, গণিত ও দর্শনের স্বর্ণযুগ ইসলামী আধ্যাত্মিকতা ও শিল্পের চূড়ান্ত রূপ 🕌 কর্ডোভার সেই মহান রাত্রি ইতিহাসবিদরা লিখেছেন, কর্ডো...