Skip to main content

এটা কি শুধু রাজশাহীতে? না, সারা দেশেই ?


 


৫ আগস্টের পর জামায়াত: হৃদয়ের কাছে থাকাদের দূরত্বের গল্প


৫ আগস্টের আগে পর্যন্ত আমি জামায়াতকে একটি মজলুম দল হিসেবে দেখতাম। বিশেষত ছাত্রশিবির থেকে উঠে আসা ভাইদের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ। তাদের সঙ্গে একে অপরের ‘আপন’ ভাবাটাই স্বাভাবিক ছিল।

মওদুদিবাদ নিয়ে যে দ্বন্দ্ব ছিল—তা নিয়ে আমি তেমন কিছু বলিনি। বরং একে কেন্দ্র করে জামায়াতের বিরুদ্ধে বিষোদগারকে সবসময় বিরোধিতা করেছি। বহুবার সাধারণ মানুষ জামায়াতের পক্ষে কথা বললে আমিও বলতাম, “ওরা ইসলামি কাজ করে।” এটাই তো মূল কথা, মতবাদের জটিলতায় সাধারণ মানুষ ক্বচিৎই যায়।

আমার ওস্তাদদের অনেকেই ছিলেন জামায়াতবিরোধী। তাদের বলা কথাগুলো আমরা তখন মানিনি। বরং তাদের বলেছি—

“জামায়াতের ভুল থাকলেও তারা আমাদের ভাই। তারা মজলুম। দয়া করে পাবলিকলি কিছু বলবেন না।”

এমনকি বর্তমান জমিয়তের সভাপতি ওবায়দুল্লাহ ফারুক সাহেবের একটি ফেসবুক পোস্টের বিরোধিতাও করেছিলাম, কেবল এই মানসিকতা থেকে যে, ‌"আমরা এক মজলুম আরেক মজলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারি না।"


কিন্তু আজ...

আজ, দীর্ঘ এক বছর পর, কষ্ট হচ্ছে—আমার এবং আমাদের ওস্তাদদের কথা আজ সত্যি হয়ে যাচ্ছে!

৫ আগস্টের পরপরই রাজশাহীতে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা শুধু হতাশাজনক নয়, ভয়ংকর।

  • মসজিদ থেকে কওমি আলেমদের জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
  • ঈদগাহের ইমামতিতে হঠাৎ করে জামায়াত ঘরানার লোক বসানো হয়েছে।
  • প্রশাসনের কাছে আলেমদের ‘আওয়ামী দোসর’ বলে প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে। অথচ জামায়াতের অনেকেই ছিলেন লিটনের আপন লোক।

আজ (শুক্রবার), সাহেববাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ২৬ বছরের ইমামকে একরকম হঠাৎ নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার জায়গায় বসানো হয়েছে সেই জামায়াত ঘরানার ‘আল্লামা’কে, যিনি ঈদগাহ দখলের ঘটনার সাথে যুক্ত।

যে ইমাম সাহেবকে সরানো হলো—তিনি উত্তরবঙ্গের অন্যতম মোতাক্কী মুহাদ্দিস, থানভী সিলসিলার খলীফা। এত সরল, মার্জিত, পাণ্ডিত্যপূর্ণ মানুষ আর দ্বিতীয়টি পাওয়া যাবে না।


জিজ্ঞাসা করি: এটাই কি 'মজলুম' জামায়াতের আচরণ?

আওয়ামী লীগের আমলে কওমি আলেমদের জেল-জুলুমের ইতিহাস কেহ অস্বীকার করতে পারে না। তারপরও আলেমরা দখল-রাজনীতিতে জড়াননি। কিন্তু জামায়াতের অনেক ভাই সেই সময় সরকারি সুবিধা নিয়েছেন, ছাত্রলীগের ছত্রছায়ায় থেকেছেন, চাকরি-বাণিজ্য করেছেন—এটা এখন ওপেন সিক্রেট।

৫ আগস্টের পর যেন তারা আবার জামায়াতে ফিরে এল, আর ‘মসজিদ-মাদ্রাসা দখল’ অভিযান শুরু করল।


এটা কি শুধু রাজশাহীতে? না, সারা দেশেই

দেশব্যাপী জামায়াত তাদের লোক ঢুকাচ্ছে মসজিদ, ঈদগাহ, মাদ্রাসায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা পাওয়া—সমস্যা না। যোগ্য হলে আসুক।
কিন্তু মসজিদে যেখানে ইলমই মূল যোগ্যতা, সেখানে শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ে ইমামতিতে বসা কি ন্যায্য?


আমাদের ওস্তাদদের কথা আজ কানে বাজে

“জামায়াত কখনো আমাদের আপন ভাবেনি, ভাববেও না।”
“তারা কওমি আলেমদের তেমন মর্যাদা দেয় না।”

সত্যি, আজ মনে হচ্ছে এই কথা সত্য। জামায়াত মনে করে—আলেমরা রাষ্ট্র বুঝে না, রাজনীতি বোঝে না, দুনিয়ার চালচিত্র জানে না। অথচ এই আলেমরাই বছরের পর বছর পাড়ায় পাড়ায় ইসলাম প্রচার করেছেন।


‘ঐক্যের’ নামে ধোঁকা

আজ যারা জামায়াতকে কেন্দ্র করে ‘ঐক্য’র গল্প বলছেন, তারা কি ভুলে গেছেন কে কবে মওদুদিবাদ তুলে মুসলিম জনতাকে বিভ্রান্ত করেছিল?

রেজাউল করিম আবরার, যিনি এখন ঐক্যের মডারেট মুখ, তিনি কি জামায়াতের সংকটে নীরব থেকেছিলেন? না, বরং তখন মওদুদিবাদ নিয়ে মঞ্চে উঠেছেন।

আজ যখন এই দ্বিচারিতার ফলাফল দেখি—আমাদের মুরুব্বিদের উপর বিশ্বাস জন্মায়। তারা যা বলেছিলেন, আমরা তখন অবজ্ঞা করেছিলাম। কিন্তু এখন দেখি, সেই কথাই বাস্তব।


শেষ কথা

আমার অনুরোধ,
👉 রাজনীতি করেন—তাতে কোনো সমস্যা নেই।
👉 মাদ্রাসা, মসজিদ দখল করবেন না।
👉 আলেমদের ছোট করবেন না।
👉 আপনারা ইসলামি ব্যাংক সামলান, বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃতি হোন, রাষ্ট্রনায়ক হন।
কিন্তু মিম্বার-মেহরাবে দখলের রাজনীতি বন্ধ করুন।

কারণ আজ আপনারা মসজিদ দখল করছেন—আগামীকাল সেখানকার মুসল্লিরাই আপনাদের প্রশ্ন করবে,

“আপনি কেন ইমাম হলেন, আপনি তো কিতাবের মানুষ না!”
“আপনার কথা তো আমাদের হুজুর বলেন না!”


যে দল একসময় আমার হৃদয়ে ছিল, আজ তাদের এই আচরণ আমাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
ভাইদের বলছি,
আল্লাহর ঘরকে রাজনীতির হাতিয়ার বানাবেন না।
এই ঘর আপনাদের ইন্তেকালের আগেই আপনাদের মুখোশ খুলে দেবে ইনশাআল্লাহ।


🖋 মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ বিন আমিন
PTI, রাজশাহী
০৭ আগস্ট ২০২৫




Comments

Popular posts from this blog

হেযবুত তওহীদ’ ॥ মতবাদ, ভ্রান্তি ও অপকৌশল : একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

সকল সংখ্যা বিভাগ লেখকবৃন্দ আপনার জিজ্ঞাসা পরিচিতি যোগাযো বর্ষ: ২১,   সংখ্যা: শাবান ১৪৪৬   |   ফেব্রুয়ারি ২‘হেযবুত তওহীদ’ ॥ মতবাদ, ভ্রান্তি ও অপকৌশল : একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা মাওলানা ফয়জুল্লাহ মুনির প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতির সাথে অতি দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি সংগঠনের নাম ‘হেযবুত তওহীদ’ । বহুরূপী এই সংগঠনটির কার্যক্রম দিন দিন বেড়েই চলেছে। ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতেও ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। যার দরুন অনেক সরলমনা মুসলমান না বুঝেই তাদের দলে যোগ দিয়ে বসছেন। অনেকেই তাদের চটকদার কথায় বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এসব দেখে ও শুনে কোনো কোনো সচেতন ভাই উলামায়ে কেরামের দ্বারস্থ হয়েছেন। জানতে চাইছেন ,  এরা কারা ?  কী তাদের উৎস ?  কেমন তাদের আকীদা-বিশ্বাস ?  আর ইসলামের নামে তারা যেসব কথা বলছে ,  এগুলোর বাস্তবতাই বা কতটুকু ? আমরা একেবারে গোড়া থেকে শুরু করছি। হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠা ও উৎস হেযবুত তওহীদ দলটির প্রতিষ্ঠাতা টাঙ্গাইলের মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী। যিনি ছিলেন কলেজপড়ুয়া একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। আরবী ভাষা সম্পর্কে তার তেমন কোনো জ্ঞান ছিল না। আর কুরআ...

মাছের চামড়ার রহস্য !

মাছের চামড়া আর চিকিৎসাবিজ্ঞান: এক বিস্ময়কর আবিষ্কার! Publisher: Al-Fatiha Foundation Platform: Muslim World আমরা বাঙালি মুসলিমরা মাছ পেলে সেটাকে কেটে, রান্না করে খেয়ে ফেলি—মাছ আমাদের রান্নাঘরের অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় একটি খাবার। কিন্তু কখনো কি আমরা গভীরভাবে চিন্তা করেছি, এই মাছ নামক প্রাণীটিকে আল্লাহ তাআলা কেমন করে সৃষ্টি করেছেন? এর চামড়া, হাড়, পেশি, রক্তনালী—সবকিছু কী নিখুঁতভাবে কাজ করে! আমরা কেবল স্বাদে মগ্ন, অথচ এর ভেতরের গঠন ও কার্যকারিতায় এক অনন্য রহস্য লুকিয়ে আছে। আর এই রহস্য আবিষ্কারে নেমেছে পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীরা। তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন মাছের এমন এক উপকারিতা, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।                       কী সেই আবিষ্কার? সম্প্রতি একদল গবেষক আবিষ্কার করেছেন যে, তেলাপিয়া (Tilapia) মাছের চামড়া মানুষের দেহে পুড়ে যাওয়া ক্ষতস্থানে ব্যবহার করলে তা খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। তারা সেই চামড়াকে এক ধরনের 'জীবন্ত ব্যান্ডেজ' হিসেবে ব্যবহার করছেন। এই মাছের চামড়া মানবচামড়ার মতোই কোলাজেন সমৃদ্ধ, নমনীয়, এবং...

হারিয়ে যাওয়া মুসলিম সভ্যতা | পর্ব ১

  হারিয়ে যাওয়া মুসলিম সভ্যতা পর্ব ১: আন্দালুস—যেখানে চাঁদ নামত মুসলিম মসজিদের গম্বুজে ✍️ লেখক: গাজী আমিনুল ইসলাম আল কাসেমী একটি সভ্যতা ছিল, যার সূর্য ডুবত না। যার ঘরে ঘরে ছিল জ্ঞানচর্চার আলয়। যার শহরে ছিল সুশৃঙ্খল রাস্তা, শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাজার হাজার পাণ্ডিত্যের উৎস। যেখানে মসজিদ ছিল লাইব্রেরি, হাসপাতাল ছিল ওয়াক্‌ফের অংশ, ও রাস্তায় রাত্রি জাগত বাতির আলো। সেই শহর, সেই ভূমি— আন্দালুস । 🌙 ইউরোপের বুকে এক মুসলিম জগত আজকের স্পেনের দক্ষিণাঞ্চল এক সময় ছিল মুসলিমদের শাসিত এক গৌরবময় ভূমি। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে তরিক ইবনে জিয়াদের অগ্নিশপথ দিয়ে যাত্রা শুরু, আর শুরু হলো এক বিস্ময়কর ইতিহাস—যা টিকেছিল প্রায় আট শতাব্দী। কর্ডোভা, গ্রানাডা, তোলে‌দো, সেভিল, আলমেরিয়া— এই শহরগুলো শুধু নাম নয়, একেকটা ছিল সভ্যতার একেকটি স্তম্ভ। ইউরোপ যখন ডুবে ছিল গোঁড়ামি, কুসংস্কার আর গির্জার আধিপত্যে, তখন আন্দালুস ছিল— গণশিক্ষার কেন্দ্র মহাকাশবিদ্যা, চিকিৎসা, গণিত ও দর্শনের স্বর্ণযুগ ইসলামী আধ্যাত্মিকতা ও শিল্পের চূড়ান্ত রূপ 🕌 কর্ডোভার সেই মহান রাত্রি ইতিহাসবিদরা লিখেছেন, কর্ডো...