১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে দিল্লী সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত ত্রিখণ্ডিত বঙ্গভূমির পূর্বাংশের গভর্নর বাহরাম খান মৃত্যুবরণ করলে তাঁর প্রধান সিলাহদার ফখরা সুবর্ণগ্রামের ক্ষমতা দখল করেন এবং নিজেকে স্বাধীন সুলতান ঘোষণা করেন। ফখরা 'সুলতান ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ' নাম ধারণ করেন এবং দিল্লীর অধিপতি মুহাম্মাদ ইবনে তুঘলকের আনুগত্য অস্বীকার করেন।
ফখরউদ্দিনের বিদ্রোহের খবর পাওয়ামাত্রই দিল্লীর সুলতান মুহাম্মাদ ইবনে তুঘলক বঙ্গভূমির অপর দুই অংশ— গৌড় ও সপ্তগ্রামের গভর্নরদের নির্দেশ দেন বিদ্রোহ দমনের জন্য। গৌড়ের গভর্নর মালিক বিদার খিলজী ওরফে কদর খান ও সপ্তগ্রামের গভর্নর আজম-উল-মুলক ইজাজউদ্দিন ইয়াহিয়া প্রথম দিকে সুলতান ফখরউদ্দিন মুবারক শাহকে পরাজিত করতে সফল হন। তাঁদের সম্মিলিত বাহিনী সুবর্ণগ্রাম (সোনারগাঁও) দখল করে নেয় এবং ফখরউদ্দিন সপারিষদ নৌকাযোগে দক্ষিণে নোয়াখালী অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ইজাজউদ্দিন ইয়াহিয়া নিজ বাহিনীসহ লুণ্ঠিত সম্পদ নিয়ে সপ্তগ্রামে ফিরে গেলেও কদর খান সুবর্ণগ্রামেই অবস্থান করতে থাকেন বিদ্রোহী মুবারক শাহর অপেক্ষায়।
অতঃপর বর্ষার আগমনে বাংলার জলাশয় ও খালসমূহ নদীতে এবং নদীগুলো 'মহানদী'তে পরিণত হলো। সুলতান ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ শক্তি সঞ্চয় করে তাঁর নৌবহর নিয়ে নোয়াখালী থেকে সুবর্ণগ্রামের দিকে অগ্রসর হন। বর্ষার কর্দমাক্ত জমিনে অনভিজ্ঞ কদর খান সুলতান ফখরউদ্দিনের নৌশক্তির সামনে টিকতে না পেরে পরাজিত হন।
ফখরউদ্দিন মুবারক শাহর কূটকৌশলে 'গণিমত' বণ্টন নিয়ে অসন্তুষ্ট নিজেরই সৈনিকদের একাংশের হাতে কদর খান শোচনীয়ভাবে নিহত হন। এইভাবে সুবর্ণগ্রামকে কেন্দ্র করে পূর্ববঙ্গ দিল্লী সালতানাতের অধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হয়।
সুলতান ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ দক্ষিণে থাকা স্থানীয় হিন্দু রাজাদের একে একে বশ্যতা স্বীকার করাতে থাকেন এবং ত্রিপুরার রাজাকে পরাজিত করে 'সমতল ত্রিপুরা' অর্থাৎ কুমিল্লা–ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চল নিজ রাজ্যভুক্ত করেন। সেইসময় পুরো চট্টগ্রাম ছিলো ত্রিপুরা রাজ্যভুক্ত।
সুলতান এবার মনোনিবেশ করলেন চট্টগ্রাম বিজয়ের।
১১৯২ সালে হিন্দুস্তানে স্থায়ীভাবে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পীর-আউলিয়াগণ ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে গমন করতে থাকেন । সমরনায়ক, সৈনিক, আমীর-ওমরাহদের পাশাপাশি সেন্ট্রাল এশিয়া, পারস্য ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলায় আসতে থাকেন ভাগ্যান্বেষী অসংখ্য মানুষ।
চট্টগ্রাম কে বলা হয় 'বারো আউলিয়ার দেশ',
তবে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বারো জন ইসলাম প্রচারকের সকলে একসঙ্গে চট্টগ্রামে আসেন নি।
সম্ভবত তারা দুই-তিন জন এক এক দলে অথবা জনে জনে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। জনশ্রুতি অনুসারে পীর বদর শাহ, কতল পীর এবং মহসিন আউলিয়া সর্বপ্রথম একসঙ্গে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এসেছিলেন। মুসলিম চট্টগ্রাম বিজয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পীর কদল খান গাজী (রহ.)
তাঁর পরিচয় সর্ম্পকে ইতিহাসে আমরা দুইটি মত দেখতে পাই..
সপ্তদশ শতকের বিখ্যাত কবি মুহাম্মদ খান রচিত ‘মক্তুল হোসেন’ গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সমন্বয়ে গবেষকরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে পীর কদল খান গাজী তাঁর শিষ্য গাজীদের সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রাম বিজয় করে তা সুলতান মুবারক শাহর রাজ্যভুক্ত করেন।
অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, কদল খান গাজী ছিলেন সুলতান ফখরউদ্দিন মুবারক শাহর সেনাপতি।
অপর মত অনুসারে, হযরত কদল খান গাজী (রহ.) ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে এসেছিলেন। তিনি ত্রিপুরার রাজার শাসনাধীন চট্টল/চট্টগ্রাম জয় করার লক্ষ্যে নিজ শিষ্যদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লে মুবারক শাহ্ তাঁকে সামরিক সাহায্য প্রদান করেন।
কবি মুহাম্মদ খান কর্তৃক আনুমানিক ১৬৪৬ সালে রচিত ‘মক্তুল হোসেন’ কাব্যের শুরুতেই আমরা দেখতে পাই চট্টগ্রামের স্থানীয় মানুষের ইসলাম গ্রহণের সেই গৌরবগাঁথা।
কদলখান গাজী তাঁর ১১ জন শিষ্যকে সাথে নিয়ে চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচার করেছিলেন।
গোলাম সাকলায়েন রচিত 'বাংলাদেশের সূফী-সাধক' বইতে বারো আউলিয়ার মধ্যে কয়েকজনের নাম জানা যায়। যথা- শেখ ফরিদ, বদর আউলিয়া, কতল পীর, মহসিন আউলিয়া, শাহ পীর, শাহ উমর, বাদল শাহ, শাহ জায়েজ এবং চাঁদ আউলিয়া।
একথা ঐতিহাসিক সত্য যে হযরত কদল খান গাজীর (রহ.) মাধ্যমেই সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম মুসলিমদের দ্বারা বিজিত হয়েছিলো। মক্তুল হোসেন গ্রন্থে উল্লেখ আছে:
"এক মনে প্রণাম করম বারে বার
কদলখান গজী পীর ত্রিভূবনের সার
যাঁর রণে পড়িল অক্ষয় রিপুদল
ভএ কেহ মজ্জি সমুদ্রের তল!
একসর মহিম হইল প্রাণহীন।
রিপুজিনি চাটি গ্রাম কৈলা নিজাধীন
বৃক্ষডালে বসিলেক কাফিরের গণ
সেই বৃক্ষ ছেদি সবে করিলা নিধন!
তান একাদশ মিত্র করম প্রণাম
পুস্তক বাড়এ হেতু না লেখিলু নাম
তান একাদশ মিত্র জিনিয়া চাটিগ্রাম
মুসলমান কৈলা চাটিগ্রাম অনুপাম!"
অর্থাৎ কবি মুহাম্মাদ খান মুসলিমদের চট্টগ্রাম জয়ের বর্ণনা দিয়ে বলছেন-
তোমরা সবাই এক মনে বারবার পীর কদল খান গাজির প্রতি শ্রদ্ধা জানাও। চট্টল বিজয়ী এই বীর পীর কদল খান যেন ত্রিভুবনের অহংকার! যাঁর রণনিপুণতায় শত্রুদের দর্প চূর্ণ হয়েছিলো, যাঁর ভয়তে শত্রুরা সমুদ্রের তলদেশে নিমজ্জিত হয়েছিলো। তিনি চট্টল নিজের অধীনে আনলেন।
কবি কদল গাজির রণনিপুণতার প্রশংসায় আরও বলছেন-
কাফিররা বৃক্ষের উপরে উঠে আশ্রয় নিলেও তাঁর হাত থেকে রেহাই পান নি। বৃক্ষ ছেদনপূর্বক শত্রুদের তিনি নিধন করেছেন।
তাঁর এগারোজন শিষ্যের প্রশংসায় কবি তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, তাঁদের কারণেই চট্টগ্রাম মুসলিম অধ্যুষিত হয়ে যায়-
"তান একাদশ মিত্র জিনিয়া চাটিগ্রাম
মুসলমান কৈলা চাটিগ্রাম অনুপাম!"
প্রাক-ইসলামি যুগে বাংলার অধিকাংশ নগর সেই নগরের উপাস্য কুলদেবতা বা কুলদেবীর নামে নামাঙ্কিত হতো। তাই প্রত্যেকটি স্থানের সাথেই একজন দেবতা বিশেষ করে দেবীর নাম পাওয়া যায়। যেমন ঢাকার নামের সাথে যুক্ত দেবী ঢাকেশ্বরী, তেমনি চট্টগ্রামের সাথে চট্টেশ্বরী, কোলকাতার সাথে কালীঘাট, ইত্যাদি।
মুজাহিদরা কাফিরদের থেকে কোনো নগর জয় করে সর্বপ্রথম তাঁরা সেই শহরের আরাধ্য কুলদেবতার মূর্তি ধ্বংস করে তাওহিদের বিজয় ঘোষণা করতেন, ইসলামের রাজনৈতিক বি জ য় ঘোষণা দিতেন ।
চট্টগ্রাম বিজয়ের সময়ে মুজাহিদরা চট্টেশ্বরী দেবীর মূর্তি ধ্বংস করে ইসলামের বিজয় ঘোষণা করেন ।
মুহাম্মদ খান রচিত 'মক্তুল হােসেন' কাব্যে চট্টেশ্বরীর মূর্তি ধ্বংস করার এবং দলে দলে চট্টলবাসীর ইসলাম গ্রহণের বিবরণ বিদ্যমান-
"তান এক মিত্রে বধিলেক চাটেশ্বরী
মুসলমান কৈল সব চাটিগ্রাম পুরী!"
নগরের কুলদেবীকে হিন্দুরা নগরের রক্ষাকর্তা হিসেবে মান্য করতো এবং তাদের ধারণা ছিলো, যত যাই হোক না কেন- চন্দ্রনাথ পাহাড়ে অবস্থিত চট্টেশ্বরী দেবীর মূর্তির কারণেই "যবন"রা (মুসলিম) চট্টগ্রামে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হবে। তাদের এ ধারণার মুখে চাপেটাঘাত করে কদল খান গাজির জনৈক শিষ্য চট্টেশ্বরী মূর্তি ধ্বংস করলেন এবং স্থানীয় সাধারণ চট্টলবাসী এই দৃশ্য দেখে এতোদিন ব্রাহ্মণরা তাদের সাথে যে প্রতারণাটি করেছিলো তা বুঝে গেলেন এবং বুঝলেন, চন্দ্রনাথ পাহাড়ে বসে থাকা পাথুরে মূর্তির কার্যত কোনো ক্ষমতাই নেই।
তারপর তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করলেন, 'মুসলমান কৈল সব চাটিগ্রাম পুরী।'
কদল খান গাজী সোনারগাঁওর সুলতান ফখরউদ্দিন মুবারক শাহের (১৩৩৮-১৩৪৯) সেনাপতি বলে কথিত। চট্টলা (চট্টগ্রাম) বিজয়কালে হাজী খলিল ও বদর আলম তাঁর সঙ্গী ছিলেন। তাঁরা চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচারে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। চট্টগ্রাম শহরের উত্তর দিকে কদল খান গাজীর মাযার আছে। স্থানীয় জনগণের মধ্যে তিনি ‘কাতাল’ বা ‘কাত্তাল পীর’ নামে পরিচিত। এ থেকে ওই স্থানের নাম হয় কাতালগঞ্জ। তিনি যুদ্ধে বহু শত্রুর শিরশ্ছেদ করে কতল (অর্থ শিরশ্ছেদ) আখ্যা পান এবং ‘কতল’ আঞ্চলিক উচ্চারণে হয়েছে "কাতাল"।
কদল খান গাজী (রহ.) এত কাফির শত্রুর শিরোচ্ছেদ করে চট্টল অধিকার করেছিলেন যে আজও তার নামের সাথে 'কতল’ বা 'শিরশ্ছেদ' শব্দটি যুক্ত হয়ে তিনি 'কাতাল পীর' নামে খ্যাত। যে স্থানটিতে তার মাজার অবস্থিত, সেই স্থানের নাম 'কাতালগঞ্জ'।
লেখক: রাজিত তাহমীদ জিত
০৩.০১.২০২৩
তথ্যসূত্রঃ
১. বাংলাদেশের সূফী-সাধক, গোলাম সাকলায়েন, ইসলামি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা: জুন ১৯৯৩
২.বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া
৩.চট্টগ্রামে ইসলাম ও ঐতিহ্য, অধ্যাপক আব্দুল করিম, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা : ফেব্রুয়ারি ২০১৮
৪.শ্রীরাজমালা, কৈলাশ সিংহ গতিধারা, ঢাকা: জানুয়ারি ২০০৯
৫. চট্টগ্রামের প্রাচীন ইতিহাস, সুনীতিভূষণ কানুনগো, বাতিঘর, চট্টগ্রাম: বাতিঘর, নভেম্বর ২০১৮
©muslim world official®Al fatiha foundation

Comments