Skip to main content

আবু সালেহ মূসা জঙ্গি দোস্ত (রহঃ) – জীবনী


 আবু সালেহ মূসা জঙ্গি দোস্ত (রহঃ) – জীবনী


আবু সালেহ মূসা জঙ্গি দোস্ত (রহঃ) ছিলেন কোরআন-সুন্নাহ পরিপূর্ণ অনুসারী, অত্যন্ত পরহেজগার, সত্যবাদী ও আল্লাহভীরু একজন মহান ব্যক্তি। তাঁর জন্ম হয়েছিল ইরাকের জিলান অঞ্চলে এক সম্ভ্রান্ত, ধার্মিক ও আলেম পরিবারে। শৈশবকাল থেকেই তিনি দুনিয়াবি ভোগ-বিলাস থেকে দূরে থেকে আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করতেন। তিনি পেশায় কৃষক ছিলেন এবং খেজুর বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন।


আবু সালেহ মূসা (রহঃ)-এর সততা ও সত্যবাদিতার একটি বিখ্যাত ঘটনা ইতিহাসে বর্ণিত আছে—

একবার তিনি তাঁর বাগান থেকে খেজুর সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করতে যাচ্ছিলেন। পথে একটি স্রোতস্বিনী নদীর পাড়ে তিনি কিছুটা বিশ্রাম নিলেন। সেখানে এক অসহায় বৃদ্ধ এসে তাঁর কাছে খাওয়ার জন্য কিছু চাইলেন। আবু সালেহ (রহঃ) নিজের খেজুর থেকে কিছু খাওয়ার জন্য তাকে দেন। কিন্তু সেই বৃদ্ধ ছিলেন আল্লাহর এক ওলি। তিনি আবু সালেহ (রহঃ)-এর সত্যবাদিতা, দয়া ও পরহেজগারী দেখে অত্যন্ত খুশি হয়ে দোয়া করেন—

“আল্লাহ তোমাকে এমন এক সন্তান দান করুন, যিনি সারা দুনিয়ার জন্য হেদায়াতের আলো হয়ে উঠবেন।”

এই দোয়ার বরকতেই আবু সালেহ (রহঃ)-এর ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন গাউসুল আজম শাইখ আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)।


আবু সালেহ মূসা (রহঃ)-এর বিয়ে হয়েছিল এক মহীয়সী ও পরহেজগার নারী উম্মুল খায়ের ফাতিমা (রহঃ)-এর সঙ্গে। ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি ছিলেন হযরত ইমাম হাসান (রাঃ)-এর বংশধর। বিয়ের সময় একটি ঘটনা বিখ্যাত—


★কিছু ইতিহাসবিদদের মতেঃ 

আবু সালেহ (রহঃ) একবার নদীর তীরে ইবাদতে লিপ্ত ছিলেন। হঠাৎ এক সাধক তাঁকে দেখলেন এবং তাঁর ভেতরের নেক চরিত্র ও পবিত্রতা চিনতে পারলেন। সেই সাধকই তাঁকে উম্মুল খায়ের ফাতিমা (রহঃ)-এর সঙ্গে বিবাহের পরামর্শ দেন। এই বিবাহ আল্লাহর হুকুমেই সম্পন্ন হয়।


★আবার কিছু সাধক এভাবে রচনা করেনঃ


>নদীর আপেলের ঘটনাঃ

একদিন আবু সালেহ মূসা জঙ্গি দোস্ত (রহঃ) নদীর তীরে হেঁটে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি পানিতে ভেসে আসা একটি আপেল দেখতে পেলেন। তিনি সেটা হাতে তুলে নিলেন। দীর্ঘক্ষণ হাঁটার কারণে তাঁর প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছিল, তাই না ভেবেই তিনি সেই আপেলটি খেয়ে ফেললেন।


কিন্তু আপেল খাওয়ার পরই তাঁর অন্তরে তীব্র অপরাধবোধ জাগল। তিনি ভাবলেন—

“আমি তো এই আপেলের মালিক নই, কারো সম্পত্তি অনুমতি ছাড়া খেয়ে ফেললাম! হায়, এটা তো আমার জন্য হারাম হয়ে গেল।”


সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি যেভাবেই হোক আপেলের মালিককে খুঁজে বের করবেন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাইবেন।


>মালিকের সন্ধান

অনেক খোঁজাখুঁজির পর তিনি জানলেন, নদীর পাশের এক বাগান থেকে আপেলটি ভেসে এসেছে। তিনি বাগানের মালিকের কাছে গিয়ে নিজের অপরাধ স্বীকার করে বললেন—


“হে আল্লাহর বান্দা! আমি ক্ষুধার্ত অবস্থায় আপনার বাগানের এক আপেল খেয়ে ফেলেছি। দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিন।”


বাগানের মালিক ছিলেন এক নেককার ব্যক্তি। তিনি বললেন—

“আমি শুধু মুখে ক্ষমা করে দিতে পারব না। এর প্রতিদান তোমাকে দিতে হবে।”


>অদ্ভুত শর্ত

আবু সালেহ (রহঃ) বিনীতভাবে বললেন—

“আপনি যা বলবেন, আমি তাই করতে প্রস্তুত।”


তখন বাগান মালিক বললেন—

“তাহলে তোমাকে আমার মেয়ে ফাতিমার সঙ্গে বিয়ে করতে হবে। তবে জেনে রেখো, সে অন্ধ, খোঁড়া, বধির এবং বোবা। যদি তুমি রাজি থাকো, তবে আমি তোমাকে ক্ষমা করব।”


আবু সালেহ (রহঃ) একটু স্তম্ভিত হলেও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তিনি রাজি হয়ে গেলেন।


>বিয়ের পরের ঘটনা

বিয়ের পর প্রথমবার স্ত্রীকে দেখতে গিয়ে তিনি অবাক হয়ে গেলেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী, চোখে দেখেন, কানে শোনেন, জিহ্বায় কথা বলেন এবং সুস্থ-সবল।


আবু সালেহ (রহঃ) আশ্চর্য হয়ে শ্বশুরকে জিজ্ঞেস করলেন—

“আপনি তো বলেছিলেন, আপনার মেয়ে অন্ধ, খোঁড়া, বোবা আর বধির! কিন্তু তো আমি উল্টোই দেখছি!”


তখন বাগান মালিক হাসিমুখে উত্তর দিলেন—

“আমি সত্য কথাই বলেছি।


সে অন্ধ, কারণ সে কখনো হারাম জিনিসের দিকে চোখ তুলে তাকায়নি।


সে বোবা, কারণ সে কখনো মিথ্যা বা গীবত করে না।


সে বধির, কারণ সে কখনো হারাম বা বাজে কথা শোনে না।


আর সে খোঁড়া, কারণ সে কখনো পা বাড়িয়ে হারামের পথে যায়নি।”


এই কথা শুনে আবু সালেহ (রহঃ)-এর চোখে পানি চলে আসে। তিনি সেজদায় পড়ে যান এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন।


এই নেককার দম্পতির ঘরেই পরে জন্ম নিয়েছিলেন বিশ্ববিখ্যাত ওলি, গাউসুল আজম শাইখ আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)।


✨ এ ঘটনা আমাদের শেখায়—

🔸আল্লাহর ভয়ে ক্ষুদ্রতম গুনাহকেও ছোট মনে করা উচিত নয়।

🔹সততা ও পরহেজগারি সবসময় আল্লাহর রহমতের দরজা খুলে দেয়।

🔸নেককার বাবা-মায়ের ঘরেই জন্ম নেয় যুগের মহাপুরুষ।


স্ত্রী উম্মুল খায়ের ফাতিমা (রহঃ)-এর গুণাবলিঃ

★তিনি ছিলেন ইমাম হাসান (রাঃ)-এর বংশধর, তাই ছিলেন আহলে বাইতের কন্যা।

★তাঁর চরিত্র ছিল পবিত্র, ঈমানদার ও পরহেজগার।

★তিনি কুরআন-হাদীস জ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন এবং রাত জেগে ইবাদত করতেন।

★তাকওয়া, দয়া, ধৈর্য ও লজ্জাশীলতার জন্য তিনি সবার কাছে শ্রদ্ধেয় ছিলেন।


আবু সালেহ মূসা (রহঃ) ও উম্মুল খায়ের ফাতিমা (রহঃ)-এর ঘরে ৪৭০ হিজরী (১০৭৭ খ্রিস্টাব্দ)-তে জন্ম নেন ইসলামি জগতের অন্যতম মহান ওলি শাইখ আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)।


★গাউসুল আজম আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)

🔹তিনি ছিলেন ইসলামের একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ওলি, “গাউসুল আজম” উপাধিধারী।

🔸তিনি আল্লাহর প্রেম ও ইলমে দীনের আলো বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

🔹তাঁর শিক্ষা, তাকওয়া, আধ্যাত্মিক ক্ষমতা এবং তাওহিদের প্রচার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।


আবু সালেহ মূসা জঙ্গি দোস্ত (রহঃ) ছিলেন পরহেজগার ও সত্যবাদী এক সাধক, আর তাঁর স্ত্রী উম্মুল খায়ের ফাতিমা (রহঃ) ছিলেন আহলে বাইতের পরহেজগার কন্যা। এই দুই নেক মানুষের মিলনেই আল্লাহ তাঁদের ঘরে দান করেছিলেন বিশ্বপ্রসিদ্ধ ওলি গাউসুল আজম শাইখ আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)-কে, যিনি আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে ইমানের আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন।



Comments

Popular posts from this blog

হেযবুত তওহীদ’ ॥ মতবাদ, ভ্রান্তি ও অপকৌশল : একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

সকল সংখ্যা বিভাগ লেখকবৃন্দ আপনার জিজ্ঞাসা পরিচিতি যোগাযো বর্ষ: ২১,   সংখ্যা: শাবান ১৪৪৬   |   ফেব্রুয়ারি ২‘হেযবুত তওহীদ’ ॥ মতবাদ, ভ্রান্তি ও অপকৌশল : একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা মাওলানা ফয়জুল্লাহ মুনির প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতির সাথে অতি দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি সংগঠনের নাম ‘হেযবুত তওহীদ’ । বহুরূপী এই সংগঠনটির কার্যক্রম দিন দিন বেড়েই চলেছে। ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতেও ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। যার দরুন অনেক সরলমনা মুসলমান না বুঝেই তাদের দলে যোগ দিয়ে বসছেন। অনেকেই তাদের চটকদার কথায় বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এসব দেখে ও শুনে কোনো কোনো সচেতন ভাই উলামায়ে কেরামের দ্বারস্থ হয়েছেন। জানতে চাইছেন ,  এরা কারা ?  কী তাদের উৎস ?  কেমন তাদের আকীদা-বিশ্বাস ?  আর ইসলামের নামে তারা যেসব কথা বলছে ,  এগুলোর বাস্তবতাই বা কতটুকু ? আমরা একেবারে গোড়া থেকে শুরু করছি। হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠা ও উৎস হেযবুত তওহীদ দলটির প্রতিষ্ঠাতা টাঙ্গাইলের মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী। যিনি ছিলেন কলেজপড়ুয়া একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। আরবী ভাষা সম্পর্কে তার তেমন কোনো জ্ঞান ছিল না। আর কুরআ...

মাছের চামড়ার রহস্য !

মাছের চামড়া আর চিকিৎসাবিজ্ঞান: এক বিস্ময়কর আবিষ্কার! Publisher: Al-Fatiha Foundation Platform: Muslim World আমরা বাঙালি মুসলিমরা মাছ পেলে সেটাকে কেটে, রান্না করে খেয়ে ফেলি—মাছ আমাদের রান্নাঘরের অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় একটি খাবার। কিন্তু কখনো কি আমরা গভীরভাবে চিন্তা করেছি, এই মাছ নামক প্রাণীটিকে আল্লাহ তাআলা কেমন করে সৃষ্টি করেছেন? এর চামড়া, হাড়, পেশি, রক্তনালী—সবকিছু কী নিখুঁতভাবে কাজ করে! আমরা কেবল স্বাদে মগ্ন, অথচ এর ভেতরের গঠন ও কার্যকারিতায় এক অনন্য রহস্য লুকিয়ে আছে। আর এই রহস্য আবিষ্কারে নেমেছে পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীরা। তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন মাছের এমন এক উপকারিতা, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।                       কী সেই আবিষ্কার? সম্প্রতি একদল গবেষক আবিষ্কার করেছেন যে, তেলাপিয়া (Tilapia) মাছের চামড়া মানুষের দেহে পুড়ে যাওয়া ক্ষতস্থানে ব্যবহার করলে তা খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। তারা সেই চামড়াকে এক ধরনের 'জীবন্ত ব্যান্ডেজ' হিসেবে ব্যবহার করছেন। এই মাছের চামড়া মানবচামড়ার মতোই কোলাজেন সমৃদ্ধ, নমনীয়, এবং...

হারিয়ে যাওয়া মুসলিম সভ্যতা | পর্ব ১

  হারিয়ে যাওয়া মুসলিম সভ্যতা পর্ব ১: আন্দালুস—যেখানে চাঁদ নামত মুসলিম মসজিদের গম্বুজে ✍️ লেখক: গাজী আমিনুল ইসলাম আল কাসেমী একটি সভ্যতা ছিল, যার সূর্য ডুবত না। যার ঘরে ঘরে ছিল জ্ঞানচর্চার আলয়। যার শহরে ছিল সুশৃঙ্খল রাস্তা, শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাজার হাজার পাণ্ডিত্যের উৎস। যেখানে মসজিদ ছিল লাইব্রেরি, হাসপাতাল ছিল ওয়াক্‌ফের অংশ, ও রাস্তায় রাত্রি জাগত বাতির আলো। সেই শহর, সেই ভূমি— আন্দালুস । 🌙 ইউরোপের বুকে এক মুসলিম জগত আজকের স্পেনের দক্ষিণাঞ্চল এক সময় ছিল মুসলিমদের শাসিত এক গৌরবময় ভূমি। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে তরিক ইবনে জিয়াদের অগ্নিশপথ দিয়ে যাত্রা শুরু, আর শুরু হলো এক বিস্ময়কর ইতিহাস—যা টিকেছিল প্রায় আট শতাব্দী। কর্ডোভা, গ্রানাডা, তোলে‌দো, সেভিল, আলমেরিয়া— এই শহরগুলো শুধু নাম নয়, একেকটা ছিল সভ্যতার একেকটি স্তম্ভ। ইউরোপ যখন ডুবে ছিল গোঁড়ামি, কুসংস্কার আর গির্জার আধিপত্যে, তখন আন্দালুস ছিল— গণশিক্ষার কেন্দ্র মহাকাশবিদ্যা, চিকিৎসা, গণিত ও দর্শনের স্বর্ণযুগ ইসলামী আধ্যাত্মিকতা ও শিল্পের চূড়ান্ত রূপ 🕌 কর্ডোভার সেই মহান রাত্রি ইতিহাসবিদরা লিখেছেন, কর্ডো...