মি‘রাজ এক অনন্ত রব্বানী ভেদ। এই ভেদের তলদেশের সীমা-পরিসীমা নেই। মি‘রাজের নিবিড় মিলনের নির্জনতায় এমন নিগূঢ় তথ্য ও রহস্য নিহিত রয়েছে, যা প্রকাশ করা চলে না। সকল রহস্যের অন্তরালে তা চিরদিন সংগোপনে রয়েছে ও থাকবে। এই রহস্যময় দ্বার উদ্ঘাটন করা জিন ও ইনসানের পক্ষে সম্ভব নয়।
প্রাসঙ্গিক ভাবনা
মি‘রাজ ঘটনার প্রেক্ষিতে কতগুলি প্রশ্ন জাগে। সংক্ষেপে এসব প্রশ্নের কিছু নিম্নে অবতারণা করা হলো :—
১. মি‘রাজের পুরো আলোচনায় স্পষ্টতঃ প্রমাণিত হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাগ্রত অবস্থায় সম্পূর্ণরূপে বাইতুল্লাহ (কাবা শরীফ) হতে বাইতুল মোকাদ্দাস এবং সেখান হতে সপ্তাকাশ ও তদূর্ধ্ব জগতে ভ্রমণ করেছেন। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করে যে, কোন রকেট বা মহাকাশযান প্রতি সেকেন্ডে ০৭ (সাত) মাইল অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় পঁচিশ হাজার দুইশত মাইলের অধিক গতি সম্পন্ন না হলে মধ্যাকর্ষণ শক্তি অতিক্রম করতে পারে না। এই পরিমাণ গতি সম্পন্ন হলেও সেই রকেট বা মহাকাশ যানটি মহাশূন্যে পৌঁছাতে দশ দিন সময় অতিবাহিত হয়। এই হিসেব ধরলেও বোরাকের গতি কমপক্ষে ঘণ্টায় দুই লক্ষ বায়ান্ন হাজার মাইলের উপর ছিল। অত্যন্ত অলৌকিক কল্পনাতীত গতিসম্পন্ন বোরাকে পিঠের উপর বসেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মি'রাজে গিয়েছিলেন। অতিদ্রুত গতি সম্পন্ন উর্ধ্বগামী এই বোরাকটি খাড়াভাবে উপরের দিকে ধাবিত হয়েছিল। ঘন্টায় দুই লক্ষ বায়ান্ন হাজার মাইল গতিসম্পন্ন একটি যানবাহনের উপর পৃথিবীর কোন মানুষের পক্ষে বসে থাকা কি সম্ভব? বোরাকের পিঠের উপরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে রইলেন কিন্তু এতে তিনি পুড়ে গেলেন না; বোরাকের পিঠ হতে পড়েও গেলেন না। তাহলে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দেহ মোবারকের স্বরূপ কেমন ছিল?
২. মি'রাজ রজনীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সঙ্গে নিয়ে জিবরাইল (আঃ) সিদরাতুল মুস্তাহা অতিক্রম করে 'সরীফুল আকলাম' পার হয়ে এক স্থানে পৌঁছে জিবরাইল (আ.) থেমে গেলেন এবং বললেন : 'যদি আমি (জিবরাইল) (আ.) আর একটু অগ্রসর হই তবে আমার ছয়শত নূরের পাখা পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে।' তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'রফরফ' নামক যানবাহনে চড়ে আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছান। ফেরেশতাদের সর্দার নূরের তৈরী। যে স্থান পার হয়ে সামনে গেলে হযরত জিবরাইল (আ.)-এর নূরের তৈরী ছয়শত পাখা পুড়ে ছাই হয়ে যায় - সেখানে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সশরীরে কিভাবে গেলেন- একটু ভেবে দেখা দরকার নয় কি?
৩. হযরত মূসা (আঃ) তুর পাহাড়ে গিয়ে আল্লাহপাককে দেখার আরজ করে বললেন : 'হে আমার সৃষ্টিকর্তা! আপনি আমাকে দেখা দিন, আমি আপনাকে দেখার আরজ করছি।' আল্লাহপাক বললেন : 'তুমি হরগেজ (কখনই) আমাকে দেখবে না। হযরত মূসা (আ.)-এর একান্ত মিনতির প্রেক্ষিতে আল্লাহপাক বললেন : 'হে মূসা! যদি আমাকে একান্তই দেখতে চাও তবে পাহাড়ের উপর নজর কর।' অত:পর আল্লাহপাক যখন পাহাড়ের উপর নূরে তাজাল্লী ছাড়লেন (তা দেখে) হযরত মূসা (আ.) মূর্ছা খেয়ে পড়ে গেলেন এবং আল্লাহপাকের নূরে তাজাল্লিতে পাহাড় পুড়ে গেল। অপরদিকে মি'রাজের রজনীতে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহুপাকের সাথে কথোপকথন করেন। এই সময় কি আল্লাহুপাকের নূরে-তাজাল্লী ছিল না? হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই নূরে-তাজাল্লী দেখে কি বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলেন? হযরত মূসা (আ.)-এর একান্ত মিনতির প্রেক্ষিতে আল্লাহুপাক পাহাড়ের উপর নূরে-তাজাল্লী ছাড়লেন তাতে পাহাড় পুড়ে গেল, সেই নূরে-তাজাল্লীতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দেহ মোবারক অক্ষত ছিল; পুড়ে যায় নাই।
ঘটনা আলোচনায় বলা যায়- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আসল রূপ যে কি ছিল তা নিরূপণ করা মানুষের সাধ্য নেই। কোন কোন ভাস্করাকার জাহেরী জ্ঞান খাটিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে একজন সাধারণ মানুষের মতো করে দেখিয়েছেন এবং মন্তব্যও করেছেন যে, তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের মতো মানুষ। তিনি সাধারণ মানুষের মতো দৈহিক গঠনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না (নাউযুবিল্লাহ)। তাদের কথার স্বপক্ষে তারা যুক্তি হিসেবে কোরআন শরীফের এই উক্তি উপস্থাপন করেন :
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَىٰ إِلَيَّ
উচ্চারণঃ “কুল ইন্নামা আনা বাশারুম মিছলুকুম ইউহা-ইলাইয়া”; অর্থাৎ (হে নবী) বলুন, আমি (দেখতে ও আকারে যদি) তোমাদের মতো একজন মানুষ কিন্তু ওহী নাযিল হয়েছে আমার উপর (সুরা আল-কাহফ/আয়াত : ১১০)।
হাত, পা, দেহ, মুখমণ্ডল ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দিক দিয়ে রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন সাধারণ মানুষের মতোই দেখতে ছিলেন। কিন্তু ওহী নাযিল হয়েছে তাঁর উপরে, এই কথাটার ভেতরেই সমস্ত ভেদ নিহিত আছে। ওহী নাযিল হওয়ার পূর্বে রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাধারণ মানুষের স্তর থেকে এমন একটা পর্যায়ে নেওয়া হয়েছিল, যখন তিনি আর সাধারণ মানুষ থাকলেন না (অধ্যাপক (অবঃ) মাওলানা আযহারুল ইসলাম ছিদ্দিকী- মারেফতের ভেদতত্ত্ব, পৃষ্ঠা ০৬-০৭)।
আকৃতিতে তিনি ছিলেন মানুষ কিন্তু প্রকৃতিতে ছিলেন ভিন্ন। প্রকৃতিতে তিনি যে ভিন্ন ছিলেন তার প্রমাণ সহীহুল বোখারী ও মুসলিম শরীফ-এর ‘সওমে বিসাল’ অধ্যায়ে রয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.), হযরত আনাস (রা.), হযরত ইবনে ওমর (রা.) প্রমুখ সাহাবাদের থেকে বর্ণিত- রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাসে ‘সওমে বিসাল’ অর্থাৎ রোজার মাঝে ইফতার না করে অবিরাম রোজা রাখতেন। তা দেখে সাহাবাদের মধ্যে অনেকে ‘সওমে বিসাল’ শুরু করে এবং অনেক সাহাবা (রা.) বেহুশ হয়ে পরে গেলেন- তা জানতে পেরে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের ‘সওমে বিসাল’ করতে বারণ করেন। সাহাবারা বললেন : ইয়া রাসুলুল্লাহ্! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ‘আপনি তো স্বয়ং ‘সওমে বিসাল’ করে থাকেন অথচ আমাদেরকে কেন বারণ করছেন? রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : ‘জেনে রাখ! আমি তোমাদের মতো নই অর্থাৎ আমার অবস্থা তোমাদের মতো নয়। তোমরা আমার মত নও। তোমাদের মধ্যে আমার উদাহরণ (মতো/সমকক্ষ) কে আছো? আমি এভাবে থাকি যে, আমার রব আমাকে পানাহার করান।’
মুসলিম (রহ.) হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ‘হে লোক সকল! আমি তোমাদের সামনে রহিয়াছি। তোমরা আমার আগে রুকু ও সেজদা করিওনা, কেন না আমি তোমাদিগকে সম্মুখিত দেখি এবং পিছন হইতেও দেখি। হাকেম এবং আবু নাঈম বর্ণনা করেছেন, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি সম্মুখের ন্যায় পিছনেও দেখে থাকি। (আল্লামা জালালুদ্দীন আবদুর রহমান সিয়ুতী (রহ.)- খাসায়েসুল কুবরা)
লেখকঃ⭐নবীজীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মি'রাজ
উৎসর্গ
হযরত মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ এসহাক (রহ) এর যোগ্যতম খলিফা কুতুব-উল-আকতাব অধ্যাপক (অবঃ) আলহাজ্জ হযরত মাওলানা
মুহাম্মদ আযহারুল ইসলাম ছিদ্দিকী সাহেব (রহ.)
যিনি ছিলেন যামানার একজন শ্রেষ্ঠ নবী প্রেমিক ও মুজাদ্দিদ, যাঁর উসিলায় এ নগণ্য বান্দার অন্তরে নবীর মহব্বত পয়দা হয়েছে, যিনি আমাকে আলোর সন্ধান দিয়েছেন—
আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ এই কিতাব খানি তাঁর স্মরণে উৎসর্গ করলাম।
মুহাম্মদ আবদুন নূর
সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা
অতিরিক্ত সচিব (অবঃ) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

Comments